
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা ইউনিয়নের ইকলিমপুর এলাকায় আখিরা শাখা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন স্থানে ধস দেখা দিয়েছে। এতে নদীর পাড়ঘেঁষা আশ্রয়ণ প্রকল্পের শতাধিক ঘর ঝুঁকিতে পড়েছে। ভাঙন ঠেকাতে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে সংস্কারকাজ চললেও স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী থেকেই ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু তুলে তা দিয়ে বাঁধ মেরামত করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তীর সংরক্ষণকাজে নদীর বালু ও মাটি ব্যবহার করে ব্লক তৈরি এবং নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কারণে বৃষ্টির পানিতে বাঁধের বিভিন্ন অংশ ধসে পড়েছে। কোথাও দেড় ইঞ্চি, আবার কোথাও আড়াই ইঞ্চির বেশি পুরুত্বের ব্লক বসানো হয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁদের। ইতোমধ্যে অনেক ব্লক ভেঙে ও দেবে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, আখিরা নদীর ভাঙনে আশ্রয়ণ প্রকল্পের দুটি ঘর এরই মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এখনো টিকে থাকা প্রায় শতাধিক ঘরও রয়েছে ঝুঁকিতে। যেকোনো সময় এসব ঘর নদীগর্ভে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।
স্থানীয় বাসিন্দা কাফী মন্ডল অভিযোগ করেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগসাজশ করে নদী থেকে বালু তুলে সংস্কারকাজ করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গভীরতা বাড়ছে এবং দুই তীরেই ভাঙন দেখা দিচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম ও বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘আমরা অভাবী মানুষ। দিনমজুরি করে জীবিকা চালাই। সরকারের দেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরই ছিল আমাদের মাথা গোঁজার একমাত্র জায়গা। এখন নদী সব কেড়ে নিচ্ছে।’
চতরা এলাকার কাওছার রহমান কাফী বলেন, এ পর্যন্ত নদীর বাম পাশে প্রায় ২০০ মিটার ব্লক দুই দফায় ধসে পড়েছে। ঠিকাদারের লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো মেরামত করছেন। তাঁর অভিযোগ, নদীর পানিতে ব্লক ডাম্পিং করা হয়নি। ফলে পানির তোড়ে ব্লক ঢলে পড়ছে।
নদীতীরবর্তী আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা রাসেদা বেগম বলেন, ‘নদীর বাম তীর পুরোটা ধসে যাওয়ার ভয় হচ্ছে। সাইটের অনেক ব্লক এমনিতেই দেবে ও ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। দুটি পরিবারের দুটি ঘরের অর্ধেক ভেঙে নদীতে গেছে। ঠিকাদারের লোকজন ঘর ঠেকাতে বাঁশের খুঁটি দিয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা আকতার জাহান বিথী অভিযোগ করেন, ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে আশপাশের আবাদি জমি ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোও ঝুঁকিতে পড়ছে।
তবে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নকারী শুল্কা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ভরদ প্রসাদ জানান, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পরামর্শেই ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলন করে সংস্কারকাজ করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, আখিরা শাখা নদী রক্ষায় চতরা ইউনিয়নের ইকলিমপুর এলাকায় ৮০০ মিটার বাঁধ নির্মাণের কাজ পেয়েছেন হাসিবুল হাসান নামে এক ঠিকাদার। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাজ শুরু হয়ে ওই বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। তবে স্থানীয়দের দাবি, নির্ধারিত সময়ের পর ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে কাজ শুরু হয়।
এ বিষয়ে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পারভেজ আহমেদ বলেন, ‘বিষয়টি আমি অবগত হয়েছি। দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ১৬ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় ‘রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার নদীতীর সংরক্ষণ, ছোট নদী, খাল-বিল পুনঃখনন ও জলাবদ্ধতা নিরসন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। এর আওতায় আখিরা শাখা নদীর তীর সংরক্ষণ, বাঁধ নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু হয়।