কারাগারে বন্দি থেকেও ‘শিক্ষা ছুটি’র নামে সরকারি সুবিধায় বেতন উত্তোলনের অভিযোগের তদন্তে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মীরবাগ ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ আলী বাবুর বেতন সাময়িকভাবে বন্ধ এবং অবৈধভাবে উত্তোলিত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়ার জন্য আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
শুধু শিক্ষক নন, তদন্তের আওতায় এসেছে কলেজটির অধ্যক্ষ আবুল কালাম মো. জয়নুল আবেদীনের ভূমিকাও। চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়সীমা লঙ্ঘন ও প্রশাসনিক অনিয়মের দায়ে তার বর্ধিত চাকরির মেয়াদকে অবৈধ বলে মত দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে তাকে বিধি অনুযায়ী চূড়ান্ত বরখাস্ত এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
গত ৩০ আগস্ট মাউশির রংপুর অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক মো. গোলাম মাজেদ ও উপপরিচালক (কলেজ) কামরুজ্জামান পাইকার স্বাক্ষরিত তদন্ত প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ করা হয়। এর আগে গত ১৯ আগস্ট তারা মীরবাগ ডিগ্রি কলেজ পরিদর্শন করে অভিযোগের তদন্ত করেন।
কারাগারে দুই মাস, তবু এমপিও শিটে নাম!
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রভাষক মোহাম্মদ আলী বাবু গত ১৫ মে রাতে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে পরদিন আদালতের মাধ্যমে কারাগারে যান। প্রায় দুই মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্ত হন।
অভিযোগের বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে তার কারাবন্দি থাকার সময়ের বেতন নিয়ে। তদন্তে বলা হয়েছে, কারাগারে থাকা অবস্থাতেও কলেজের এমপিও শিটে তার নাম তালিকাভুক্ত ছিল। এমনকি মে, জুন ও জুলাই মাসের বেতনও তাকে দেওয়া হয়। কলেজের উপস্থিতি রেজিস্টারে আবার ১০ মে থেকে তার নামের পাশে ‘শিক্ষা ছুটি’ লেখা ছিল।
তদন্ত কর্মকর্তাদের মত, রেগুলেশনের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে শিক্ষা ছুটির জন্য যে ন্যূনতম শর্ত রয়েছে—গভর্নিং বডির লিখিত অনুমোদন ও আট বছরের লিখিত চুক্তি—তা পূরণ হয়নি। ফলে ওই ছুটি অননুমোদিত।
আর ফৌজদারি মামলায় সাজাপ্রাপ্তি ও কারাবন্দি অবস্থায় বেতন উত্তোলন রেগুলেশনের ১৭ অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন এবং স্বতন্ত্রভাবে বরখাস্তযোগ্য বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অধ্যক্ষের মেয়াদ বাড়ানো নিয়েও প্রশ্ন
অধ্যক্ষ আবুল কালাম মো. জয়নুল আবেদীনের চাকরির মেয়াদ গত বছরের ৩০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র সাত দিন আগে তিনি আবেদন করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেগুলেশনের ১৫(ক)(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক তিন মাসের সময়সীমা মানা হয়নি। পরবর্তী সময়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তার মেয়াদ বৃদ্ধির অনুমোদন দিলেও চাকরিকালীন প্রমাণিত অনিয়মের কারণে ওই বর্ধিত মেয়াদ বাতিলযোগ্য বলে মত দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
এ কারণে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে রেগুলেশনের ১৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অবিলম্বে চূড়ান্ত বরখাস্ত এবং বিধি মোতাবেক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির সুপারিশ
প্রভাষক মোহাম্মদ আলী বাবুর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে গভর্নিং বডির মাধ্যমে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন, তাকে অন্তত দুইবার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নিয়ে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে ইএফটির মাধ্যমে বেআইনিভাবে উত্তোলন করা বেতন সরকারি কোষাগারে চালানের মাধ্যমে ফেরত আনার জন্য আইনি ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
মোহাম্মদ আলী বাবুর বিরুদ্ধে হজে লোক পাঠানো এবং চাকরি দেওয়ার কথা বলে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার ঘটনায় নীলফামারী থানায় দুটি এবং রংপুরের আদালতে তিনটি মামলা রয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
গত ১৫ মে রাতে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে তার অবস্থান শনাক্ত করে পুলিশ। পরে কাউনিয়া থানা ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে রংপুর মহানগর এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে।
মাউশি রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক (কলেজ) কামরুজ্জামান পাইকার বলেন, মীরবাগ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষের চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি এবং প্রভাষক মোহাম্মদ আলী বাবুর কারাগারে থেকে শিক্ষা ছুটির নামে বেতন উত্তোলন—দুটিই তদন্তে অবৈধ বলে প্রমাণিত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে প্রয়োজনীয় মতামতসহ সুপারিশ মাউশিতে পাঠানো হয়েছে। অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাউশি রংপুর অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক মো. গোলাম মাজেদ বলেন, ‘শুধু মীরবাগ ডিগ্রি কলেজ নয়, যেকোনো কলেজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
এখন তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে মাউশি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে মীরবাগ ডিগ্রি কলেজ।