Admin1234@
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০২ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ইয়াবার নামে বিক্রি হচ্ছে মায়াবড়ি, খেলে শরীরে কী ঘটে

মাত্র এক টাকার একটি বড়ি। দেখতে ছোট, গোলাকার। বাজার থেকে কিনে তাতে দেওয়া হয় লাল বা গোলাপি রঙের প্রলেপ। এরপর সেই বড়িই পরিচিত হয়ে ওঠে ‘ইয়াবা’ হিসেবে। দামও লাফ দিয়ে বেড়ে যায়—প্রতি পিস ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। তবে এটি কোনো ইয়াবা নয়। সস্তা ওষুধে রং করে ইয়াবার আদলে তৈরি করে মাদকসেবীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। অজানা ওষুধ সেবনে মাদকাসক্তদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী মহানগরীর আইডি বাগানপাড়া রেললাইন এলাকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ওই এলাকায় বিভিন্ন ধরনের মাদক কেনাবেচা হয়। মাদকসেবীদের আনাগোনাও চোখে পড়ে।

এ ছাড়া নগরীর চন্দ্রিমা থানার বারো রাস্তা, বুধপাড়া, কোট ঢালান, গুড়িপাড়া, রাজশাহী নিউমার্কেট এলাকা, হরিপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় কৌশলে ইয়াবা এবং ইয়াবার আদলে ওষুধ বিক্রির চক্র গড়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব স্থানে চক্রগুলো প্রকৃত মাদকের পাশাপাশি ইয়াবার আদলে তৈরি রং করা মায়াবড়ি ও ডুরালাক্স ট্যাবলেট বিক্রি করছে। বিশেষ করে কম দামে মাদক পাওয়ার আশায় আসা অনেক তরুণ মাদকসেবী সেখানে ছুটে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ইয়াবার আদলে এসব রং করা ট্যাবলেট মাদকসেবীদের কাছে বিক্রি করা হয়। ট্যাবলেটের গায়ে লাল বা গোলাপি রঙের মার্কার বা সাইনপেনের কালি লাগিয়ে ইয়াবার মতো চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে প্রকৃত ইয়াবা বলে মাদকসেবীদের কাছে তা বিক্রি করা হয়। জন্মনিয়ন্ত্রণ ও কোষ্ঠকাঠিন্যের এসব ওষুধেও মজেছেন মাদকসেবীরা।

নগরীর আইডি বাগানপাড়ায় গিয়ে রাফিউল ইসলাম নামে এক মাদকসেবীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ঘন ঘন অভিযানের ফলে অনেকে ইয়াবা বিক্রি করছে না। একজনের কাছ থেকে দুই পিস ‘মাল’ (ইয়াবা) নিয়েছিলেন ২৮০ টাকা পিস হিসেবে। পরে খাওয়ার সময় দেখেন, সেগুলো ওষুধ। কারণ, ওই ওষুধ খাওয়ার পর তার পায়খানার বেগ অনেক বেড়ে গিয়েছিল।

সামসুল ইসলাম নামে আরেকজনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ‘এটা ইয়াবার মতো রূপ দেওয়া হয়। কিন্তু এটা মায়া বড়ি রং করে বিক্রি হচ্ছে।’

এদিকে চিকিৎসকদের মতে, মায়াপিল (মায়াবড়ি) কোনো মাদক নয়; এটি একটি যৌগিক মুখে খাওয়ার জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি। মায়াপিলের প্রতি সাদা ট্যাবলেটে রয়েছে ইথিনাইল এস্ট্রাডিওল ০.০৩ মিলিগ্রাম ও লেভোনরজেস্ট্রেল ০.১৫ মিলিগ্রাম। আর বাদামি ট্যাবলেটে রয়েছে ফেরাস ফিউমারেট ৭৫ মিলিগ্রাম। অর্থাৎ ২৮টি বড়ির প্যাকেটে ২১টি হরমোনযুক্ত ও ৭টি আয়রন ট্যাবলেট থাকে।

মায়াপিলের প্রধান কাজ গর্ভধারণ প্রতিরোধ করা। হরমোনের মাধ্যমে এটি মূলত ডিম্বস্ফোটন বন্ধ বা দমন করে এবং জরায়ুমুখের শ্লেষ্মায় পরিবর্তন এনে শুক্রাণুর প্রবেশ কঠিন করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যেও মুখে খাওয়ার গর্ভনিরোধক বড়িকে গর্ভধারণ প্রতিরোধের স্বীকৃত পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এই ওষুধটি নারীর বিশেষ প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়, এখন সেটিই মাদকসেবীদের ইয়াবা বলে খাওয়ানো হচ্ছে।

অন্যদিকে, ডুরালাক্স ৫ মিলিগ্রাম সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ওষুধ। এর কার্যকর উপাদান বিসাকোডিল। এটি একটি স্টিমুল্যান্ট ল্যাক্সেটিভ বা রেচক, যা মূলত কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। কিছু চিকিৎসা পরীক্ষা বা কোলনের পরীক্ষার আগে অন্ত্র পরিষ্কার করতেও বিসাকোডিল ব্যবহার করা হয়।

ডুরালাক্সের অতিরিক্ত বা দীর্ঘদিনের ব্যবহার বিপজ্জনক হতে পারে। অতিরিক্ত সেবনে ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা এবং শরীরের তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমনকি অতিরিক্ত ব্যবহারে পটাশিয়ামের মাত্রাও কমে যেতে পারে। আর এই ওষুধটি কোনো কারণ ছাড়া ইয়াবা হিসেবে মাদকসেবীরা গ্রহণ করছেন। এতে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ শংকর কে বিশ্বাস জানান, ‘ইয়াবা একটি মাদকদ্রব্য। কিন্তু ডুরালাক্স ও মায়াবড়ি মাদক নয়। কিন্তু তারপরও এসব রং মিশিয়ে খেলে বা রোগ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে খেলে শরীরে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

অপরাধ বিশ্লেষক সুব্রত কুমার পালের মতে, সস্তা ওষুধ রং করে ইয়াবার আদলে বাজারজাত করার ঘটনা মাদক ব্যবসার নতুন ও উদ্বেগজনক কৌশল। প্রকৃত মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান জোরদার হলে কিছু অসাধু চক্র বিকল্প পদ্ধতিতে মাদকসেবীদের চাহিদা কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে।

এ বিষয়ে মহানগর পুলিশের মুখপাত্র (উপ-পুলিশ কমিশনার) গাজিউর রহমান জানান, ‘শুধু ইয়াবা নয়, সব ধরনের মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে মহানগর পুলিশ মাদক বিক্রির আস্তানা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং সেসব জায়গা থেকে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’ তবে মায়া বড়ি ও ডুরালাক্স ইয়াবার আদলে বিক্রি করার বিষয়ে তিনি জানেন না বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন জানান, ‘ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। মাদককারবারিদের ওষুধ রং করে বিক্রি করা নতুন কৌশল হতে পারে। সুনির্দিষ্ট কারও বিরুদ্ধে মাদকের বিষয়ে তথ্য দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Facebook Comments Box

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রংপুরে অবৈধভাবে সয়াবিন তেল কারখানায় অভিযান, মালিকের ১ মাসের কারাদণ্ড

১

বিএনপিকে হেয় করতেই সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে জামায়াত’

২

শাহজালালে দুই যাত্রীর কাছ থেকে ৮১.৫০ লিটার বিদেশি মদ আটক

৩

এক পা অচল, তবুও থেমে নেই রংপুরের কাউনিয়ার একরামুল; গাছের ডালপালা কেটেই পরিবার চালাচ্ছেন

৪

ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটেন, গাছের মগডালে উঠে সংসার চালান একরামুল

৫

অবহেলিত রংপুরের উন্নয়নে সরকার কাজ করছে: মীর শাহে আলম

৬

কুড়িগ্রামে কাশবনে কফি শপের আড়ালে মাদক জুয়া ও অশ্লীল নৃত্য, গুঁড়িয়ে দিল পুলিশ

৭

নেতা-কর্মীর গায়ে হাত উঠলে লাশের বদলে লাশ, থানার ইট খুলে নেওয়ার হুমকি এনসিপি নেতার

৮

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ রাশেদ খাঁনের

৯

শিক্ষিকাকে অপহরণ চেষ্টার অভিযোগ, ছাত্রদল নেতা বললেন ‘সিএনজিতে ঘুরে বেড়িয়েছি’

১০

৫০০ টাকা বেশি দিয়েও মিলছে না এলপি গ্যাস

১১

এক গ্রাহকেরই বিদ্যুৎ বিল ৫০৬ কোটি টাকা

১২

সংসার গুছিয়ে নেওয়ার আগেই ডেঙ্গুতে চলে গেলেন চিকিৎসক আঁচল

১৩

বাংলাদেশের ওষুধে ১০০ শতাংশ শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা ট্রাম্পের

১৪

ইয়াবার নামে বিক্রি হচ্ছে মায়াবড়ি, খেলে শরীরে কী ঘটে

১৫

কাউনিয়ায় নর্থ বেঙ্গল স্কুলে রেজাল্ট শিট বিতরণ

১৬

কাউনিয়ায় আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত

১৭

পীরগঞ্জে ভোটার হতে এসে রোহিঙ্গা সন্দেহে যুবক আটক

১৮

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে অ্যানথ্রাক্সের ভয়াবহ থাবা: আতঙ্কে পানির দামে গরু বিক্রি খামারীদের

১৯

পরিবারের ওপর অভিমান ও বিটিএস প্রভাবে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা: পথ হারিয়ে কুড়িগ্রামে উদ্ধার ৩ স্কুলছাত্রী

২০