
মাসখানেক আগে (২০ আগস্ট) নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন রংপুরের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান। এর আগের দিন মাদারীপুরের শিবচরের বাখরেরকান্দি এলাকার একটি জঙ্গলে এক নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। ঘটনার পাঁচদিন পর আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে ওই নারীর এক বছর বয়সী শিশুসন্তানের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
ধারাবাহিকভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটছে। পাশাপাশি অপহরণের ঘটনায়ও থানায় মামলা হচ্ছে নিয়মিত। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট এই আট মাসে সারাদেশে দুই হাজার ৩৬২টি হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকায় হত্যা মামলা হয়েছে ১৬৮টি। হিসাব বলছে, প্রতিদিন প্রায় ১০টি করে হত্যা মামলা হয়েছে গত আট মাসে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাসের হিসাবে সর্বাধিক হত্যা মামলা হয়েছে জুন মাসে, সর্বনিম্ন ফেব্রুয়ারিতে। জানুয়ারি মাসে হত্যার ঘটনায় সারাদেশে মামলা হয়েছে ২৮৭টি (ঢাকায় ২১), ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি (ঢাকায় ১৬), মার্চে ৩১৭টি (ঢাকায় ২৪), এপ্রিলে ২৮৮টি (ঢাকায় ১৭), মে মাসে মামলা হয়েছে ৩১০টি (ঢাকায় ১৬টি), জুনে ৩২৬টি (ঢাকায় ২৩), জুলাইয়ে ২৯৮টি (ঢাকায় ৩১) এবং আগস্ট মাসে হত্যার ঘটনায় সারাদেশে মামলা হয়েছে ২৮৬টি, এর মধ্যে ঢাকায় ২০টি।
হত্যার পাশাপাশি অপহরণের ঘটনাও ঘটছে একের পর এক। গত ১৩ মে মিরপুরের পল্লবী এলাকায় প্রতিদিনের মতো বাসার সামনে খেলছিল ইব্রাহিম। সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, সন্ধ্যা ঠিক ৭টা ২১ মিনিটে তাকে হঠাৎ বাসার ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা যায়। তবে সে একা ছিল না। তার পেছনে পেছনে এক ব্যক্তিকেও ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইব্রাহিমের একটি চিৎকার শোনা যায়। এর মাত্র কয়েক মিনিট পর ভেতরে প্রবেশ করা সেই ব্যক্তিকে তড়িঘড়ি করে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে দেখা যায়। কিন্তু ইব্রাহিমের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
গত ২০ আগস্ট মাদরাসায় যাওয়ার কথা বলে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকার বাসা থেকে বের হয় মো. তানভীর আহমেদ (১০)। এরপর আর তানভীরের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট এই আট মাসে সারাদেশে ৬৯১টি অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকায় অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১২৯টি। অর্থাৎ, সারাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিনটি করে অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে।
জানুয়ারি মাসে অপহরণের ঘটনায় সারাদেশে মামলা হয়েছে ৮৭টি (ঢাকায় ১৪), ফেব্রুয়ারিতে ৬৪টি (ঢাকায় ১২), মার্চ মাসে ১০২টি (ঢাকায় ২০), এপ্রিলে ৯৪টি (ঢাকায় ২১), মে মাসে ৯০টি (ঢাকায় ১৩), জুনে ৯০টি (ঢাকায় ১৭), জুলাইয়ে ৭২টি (ঢাকায় ১১) এবং আগস্ট মাসে অপহরণের ঘটনায় সারাদেশে মামলা হয়েছে ৯২টি, এর মধ্যে ঢাকায় ২১টি।
২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে সারাদেশে অপহরণের ঘটনায় মামলা ছিল ৭১৫টি, এর মধ্যে ঢাকায় ১৭৩টি। একই সময়ে হত্যা মামলা ছিল দুই হাজার ৬১৪টি, এর মধ্যে ঢাকায় ৩২৪টি। গত বছরের সঙ্গে তুলনা করলে চলতি বছর হত্যা-অপহরণ তুলনামূলক কম।
‘অপরাধ বাড়ার জন্য চাঁদাবাজি দায়ী’
এখন সংঘটিত অপরাধ বেড়েছে আমরা যেটাকে অর্গানাইজড ক্রাইম বলি। দেশে যেহেতু চাঁদাবাজি বেড়েছে, সেহেতু এই চাঁদাবাজির কারণে দেশে অপহরণ-হত্যা এগুলো বেড়েছে।- অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক
সমাজে অপরাধ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে চাঁদাবাজিকে দায়ী করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। অপরাধ বিশেষজ্ঞ মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন সংঘটিত অপরাধ বেড়েছে আমরা যেটাকে অর্গানাইজড ক্রাইম বলি। দেশে যেহেতু চাঁদাবাজি বেড়েছে, সেহেতু এই চাঁদাবাজির কারণে দেশে অপহরণ-হত্যা এগুলো বেড়েছে।’
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ক্রাইম প্রিভেনশনের জন্য তিন ধরনের স্ট্র্যাটেজি আছে- প্রাইমারি প্রিভেনশন, সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি। টারশিয়ারি লেভেলটা আমরা গুরুত্ব দিই রাষ্ট্রের দিক থেকে, কারণ রাষ্ট্র আমাদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, দিতে পারে না। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যথাযথভাবে রুল অব ল বেশি পরিমাণে প্রয়োগ করতে হবে।’
রাজনীতিমুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কাজ করতে হবে। যে কোনো অপরাধ মোকাবিলার জন্য যদি তারা আইনের আলোকে শক্তিশালী পদক্ষেপ নেয়, তাহলে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
এছাড়াও পারিবারিক, সামাজিক পরিবেশে আমরা যারা আছি, আমাদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ।
গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন হামলা ও সেগুলোর বিচার না হওয়ায় ডিমোরালাইজড হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের ভেতর কনফিডেন্স তৈরি করা দরকার। মনস্তাত্ত্বিকভাবে যে কাউন্সিলিং এটা দরকার। আর একটা ফোর্সকে ইউনাইটেড ফোর্স হিসেবে তৈরি করার জন্য রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ এখানে স্পেসটা দিতে হবে। রাষ্ট্রকে এটা এনশিওর করতে হবে যে, পুলিশ ছাড়া রাষ্ট্র চলবে না, রাষ্ট্র ছাড়া পুলিশ থাকবে না।’
সম্প্রতি রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যে বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি, সেখানে জনগণের প্রত্যাশা, আইনের শাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি-সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়েছে। আমরা যে শৃঙ্খলা বাহিনী উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি, তা ছিল একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় পুলিশসহ শৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল ও কর্মপরিবেশ অত্যন্ত নাজুক ছিল। গত কয়েক মাসে সেই অবস্থার পরিবর্তন করা সম্ভব হয়েছে। তাদের মনোবল ফিরে এসেছে এবং তারা পূর্ণ শক্তি দিয়ে অপরাধ দমনে সচেষ্ট হয়েছে। এত অল্প সময়ে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা ঠিক হবে না।
যখন কোনো একটি ঘটনা কেন্দ্র করে সারাদেশে হইচই পড়ে যায়, তীব্র আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়, তখন যারাই সরকারে থাকেন কিংবা রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো একটু নড়ে-চড়ে বসে। কিছু একটা করছে এটাকে দৃশ্যমান করতে চায়। এভাবে চলার কারণেই আমাদের অপরাধের ঘটনাগুলো বেশি।-অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হকের মতে, ‘যখন কোনো একটি ঘটনা কেন্দ্র করে সারাদেশে হইচই পড়ে যায়, তীব্র আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়, তখন যারাই সরকারে থাকেন কিংবা রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো একটু নড়ে-চড়ে বসে। কিছু একটা করছে এটাকে দৃশ্যমান করতে চায়। এভাবে চলার কারণেই আমাদের অপরাধের ঘটনাগুলো বেশি।’
তিনি বলেন, ‘এই অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে হাতেগোনা কয়েকটি কারণ আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা ছিল, এক ধরনের অস্থিতিশীল অবস্থা ছিল, তা কিন্তু এখনো আছে। অনেক মানুষের মধ্যেই এই মানসিকতা তৈরি হয়েছে যে, চাইলেই যা খুশি তাই করা যায়। আইনশৃঙ্খলা ভাঙা যায়, কাউকে হত্যা করা যায়।’
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘হত্যা ও অপহরণের সঙ্গে আনুষঙ্গিক আরও কিছু অপরাধ আছে, যেগুলো প্রতিরোধে কমন কিছু কাজও আছে, সেগুলো আমরা করি। যেমন, একটি হলো প্রতিরোধে কাজ করি, আরেকটা হলো অপরাধী শনাক্তকরণে কাজ করি।’
তিনি বলেন, ‘অপরাধ প্রতিরোধের জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের ডিউটি দিই। যেমন, মোবাইল ডিউটি, মোটরসাইকেল প্যাট্রোলিং, ফুট প্যাট্রোলিং, পিকেট ডিউটি, বিভিন্ন ধরনের তল্লাশি, বিভিন্ন ধরনের মিটিং, কমিউনিকেশন, কমিউনিটি পুলিশিং, বিট পুলিশিং ইত্যাদি।’
‘অপরাধ ঘটার পর পুলিশের প্রথম দৃষ্টি থাকে যে এটি কত দ্রুত পুলিশ রেসপন্স করে, আমরা সেটাই চেষ্টা করি। অপরাধ ডিটেক্ট করে এটার সঙ্গে কারা সম্পৃক্ত সেটাতে আমরা কাজ করি। সেক্ষেত্রে ডিএমপিতে থানা পুলিশের পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি ঘটনায় কিন্তু আমাদের ডিবি পুলিশ একটা ছায়া তদন্ত পরিচালনা করে।’
অধিকাংশ কেসের ক্ষেত্রেই ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত আসামিদের ডিএমপি গ্রেফতার করেছে, আদালতে উপস্থাপন করেছে ও ঘটনার রহস্য উন্মোচন করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ সংগঠনের পর অপরাধীদের গ্রেফতারে কাজ করছি।