
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফাতের আহত হওয়ার দুই ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও খোঁজ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এমন অভিযোগ সহপাঠীদের। শেরে বাংলা মেডিকেলে অবহেলায় আরাফাত পড়ে ছিলো দুই ঘন্টা। বাংলা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. রাজিব অভিযোগ করছেন প্রশাসনকে একাধিকবার কল করে দুই ঘন্টা পর্যন্ত তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি৷ প্রশাসনের কাছে একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করার কথা বললেও তারা সেটা তো পারেনি সাধারণ সরকারি একটা অ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজ করতেও কালক্ষেপণ করেছেন। অবশেষে রাত দশটার দিকে ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর চিকিস্যাধীন অবস্থায় মারা যান আরাফাত।
আরাফাতের মৃত্যুতে এমন অবহেলা ও ক্ষতিপূরণ দাবি করে আজ বিকেল সাড়ে ৫টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে গায়েবানা জানাজা নামাজ শেষে ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়ক অনিদৃষ্টকালের জন্য অবরোধ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা
রোববার ৯ আগস্ট বিকেলে সাড়ে ৩টায় বরিশাল দপদপিয়া সেতুতে বাস-মাহিন্দ্রোর মুখোমুখি সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আরাফাত গুরুতর আহত হন। আরাফাতকে পথচারীরা উদ্ধার করে তাৎক্ষণিক শেরে বাংলা মেডিকেলে জরুরি বিভাগে ভর্তি করে। খবর পেয়ে সাথে সাথে মেডিকেলে উপস্থিত হন বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ৩:৪৫ এর দিকে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী রাজিব বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে কল দিয়ে আরাফাতের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিকট সাহায্যের দাবি জানান। কিন্তু প্রশাসনের ইতিবাচক সাড়ার বিপরীতে মিলেছে শুধুই অবহেলা বলছিলেন রাজিব।
অবশেষে বিকেল ৫:৩০ মিনিটে শেরে বাংলা মেডিকেলে পৌঁছান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ রেজিস্ট্রার। ততক্ষণে রাকিবের অবস্থার অবনতি হয় আরও বেশি কয়েকবার রক্তবমিও করেছেন। আমরা চেয়েছিলাম এয়ার এম্বুলেন্স কিন্তু শেরে বাংলা মেডিকেলের একটি সরকারি এম্বুুলেন্স ব্যবস্থা করে দেয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. আবদুল আলিম বছির অবহেলার অভিযোগের বিষয়ে বলেন, আমরা যখন দুর্ঘটনার সংবাদ পেয়েছি সাথে সাথে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। আমাদের প্রক্টর ঢাকায় অবস্থান করছিলেন তিনি অহত শিক্ষার্থীর সাথে ঢাকা মেডিকেলে ছিলেন ঐ শিক্ষার্থীর বাড়িতে গিয়েছেন প্রক্টর। আমরা আমাদের দিক থেকে কোনো গাফিলতি রাখিনি এরপর আমাদের অবহেলা বা দায় থাকলে সেটা আমরা মাথা পেতে নিচ্ছি।
আরাফাতের সহপাঠীরা বলছিলেন, আমরা শেরে বাংলা মেডিকেলে ভর্তির পর যখন ডাক্তার জানালেন এখানে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব না ঢাকায় পাঠাতে হবে তখন থেকে এয়ার এম্বুলেন্সের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে আমাদের সিনিয়ররা যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তেমন কোনো সাড়া পায়নি। তারপর দু’ঘন্টা পরে দায়সারাভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে শেরে বাংলা মেডিকেলের একটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়।
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রাজিব বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কল করেছি একটা অ্যাম্বুলেন্সের জন্য তারা আমাদের বলে গেছে তারা মেডিকেলে গিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে দিবে। প্রায় তিন ঘন্টা পরে গিয়ে তারা অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে দিয়েছে সেখানে গিয়ে ফেসভ্যালু দেখিয়ে কেন অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে তার আগে কেন করা যায়নি সেই প্রশ্ন রাখেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে। আরাফাতের মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবহেলার দায় রয়েছে এই দায় তারা কোনোভাবে এড়িয়ে যেতে পারে না। এই দায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রক্টরসহ প্রশাসনের সবাইকে নিতে হবে।
ফেসবুক পোস্টে রাকিব ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ভার্সিটি প্রশাসনের সাথে অনেকক্ষণ যোগাযোগ করেও এম্বুলেন্সে পাচ্ছিলাম না একটা পেলাম তার মধ্যে কোনো ফার্স্ট এইডের ব্যবস্থাই নেই।আবার কিছুক্ষণ পরপর অক্সিজেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসার পর সবাই তো বলছিলো আপনারা ভার্সিটি প্রশাসনেকে বলে একটা এয়ার এম্বুলেন্স রেডি করতে পারলেন না ৫০/৬০ মিনিট লাগতো। তারা তো আর জানে না যেই ভার্সিটিতে নড়েবড়ে একটা মাত্র এম্বুলেন্স সেখানে এয়ার এম্বুলেন্স তো বিলাসিতা। আক্ষেপ তো একটা জায়গায় আর ঘণ্টা খানেক আগে তাকে নিয়ে আসতে পারতাম অন্তত চিকিৎসাটা তো পেতো। শুধুমাত্র চিকিৎসার অভাবে চোখের সামনে একটা তাজা প্রাণ ঝড়ে গেলো।”
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মৃত্যুঞ্জয় বলেন, আমার ভাই ইয়াসিন আরাফাত দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাসপাতালে টানা তিন ঘণ্টা পড়ে ছিল। আমরা বারবার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। ফোন দিয়েছি, সহযোগিতা চেয়েছি। কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি। প্রায় তিন ঘণ্টা পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নেওয়ার পথে আমার ভাইয়ের অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ঢাকা পৌঁছানোর পরই আমার ভাই মারা যায়। আমার ভাইকে আমরা আর ফিরে পাব না। কিন্তু প্রশাসনের অবহেলা বা গাফিলতির কারণে যেন আর কোনো শিক্ষার্থীকে এভাবে জীবন দিতে না হয়, সেটিই এখন আমাদের দাবি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ বলেন, আমরা ঘটনা যখন জানতে পেরেছি সাথে সাথে আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। সড়ক দুর্ঘটনার কারনে রাস্তায় জ্যাম থাকায় আমাদের যেতে কিছুটা দেরি হয়েছে। এয়ার এম্বুলেন্স কেন ম্যানেজ করা যায়নি এমন প্রশ্নে উপাচার্য বলেন, ঐসময় তাৎক্ষণিক আমরা এসি এম্বুলেন্স করে তারা ঢাকায় পাঠিয়েছি, তখন পর্যন্ত এয়ার এম্বুলেন্সের কথা কেউ ঐভাবে বলেনি আর আমরা ভাবছিলাম দ্রুত কি করা যায় সেজন্য তাকে দ্রুত এম্বুলেন্সে করে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল।”