
শহরের ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন হাজার মানুষ আসে-যায়। কেউ কারও দিকে তাকায় না, অথচ কখনও কখনও সেই ভিড়ের মধ্যেই একজন মানুষ এসে দাঁড়ায়—যার উপস্থিতি বদলে দেয় পুরো পৃথিবীর অর্থ।
বিকাশের জীবনটাও ছিল তেমনই একঘেঁয়ে। অফিস, বাড়ি আর জানালার পাশে বসে সন্ধ্যার আকাশ দেখা—এই ছিল তার পৃথিবী। ভালোবাসা শব্দটাকে সে অভিধানে দেখেছিল, জীবনে নয়।
এক বর্ষার বিকেলে বাসস্ট্যান্ডে দেখা হয় শ্যামলীর সঙ্গে। হাতে ছাতা, চোখে অদ্ভুত শান্তি। হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়ায় শ্যামলীর কাগজগুলো উড়ে গেল। বিকাশ ছুটে গিয়ে কাগজগুলো কুড়িয়ে দিল।
—“ধন্যবাদ।”
মাত্র একটি শব্দ। অথচ বিকাশের মনে হলো, বহুদিনের নীরব ঘরে যেন কেউ একটি জানালা খুলে দিয়েছে।
তারপর থেকে দেখা হতে লাগল। কখনও বাসস্ট্যান্ডে, কখনও বইয়ের দোকানে, কখনও নদীর ধারে। তাদের কথাগুলো খুব সাধারণ—বৃষ্টি, বই, আকাশ, স্বপ্ন। কিন্তু সেই সাধারণ কথার ভেতরেই জন্ম নিল এক অসাধারণ টান।
একদিন শ্যামলী বলল, —“জানো, মানুষের মন হারিয়ে যায় কোথায়?”
বিকাশ হেসে বলল, —“জানি না।”
শ্যামলী নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, —“যেখানে তার কথা না বলেও কেউ বুঝতে পারে, সেখানেই।”
কিছুদিন পর শ্যামলী শহর ছেড়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে শুধু একটি চিঠি রেখে গেল বিকাশের হাতে।
চিঠিতে লেখা ছিল—
“আমাদের পথ হয়তো এক নয়। কিন্তু তুমি আমাকে যে কয়েকটি সন্ধ্যা দিয়েছ, সেগুলো আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ঠিকানা হয়ে থাকবে। কখনও যদি আমাকে খুঁজতে ইচ্ছে করে, নদীর ধারে এসো। সেখানে হয়তো আমাকে পাবে না, কিন্তু তোমার নিজের মনটাকে ঠিকই খুঁজে পাবে।”
বহু বছর কেটে গেল।
বিকাশ মাঝে মাঝে সেই নদীর ধারে বসে থাকে। শ্যামলী আর ফিরে আসেনি। তবু বিকাশ জানে, সে হারিয়ে যায়নি।
কারণ কিছু মানুষ জীবনে থেকে যায় না—মনের ভেতর ঠিকানা হয়ে থেকে যায়।
আর বিকাশের কাছে সেই ঠিকানার নাম—
“মন হারানোর ঠিকানা।”