
বাহ্যিকভাবে দেখলে মনে হবে তার মতো আর ভালো মানুষ নাই। কিন্তু তার এই ভালো মানুষের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর এক পৈশাচিক রূপ। বলছি- দিনাজপুর জেলার ভারপ্রাপ্ত শিশু কর্মকর্তা ওয়াহেদ আলীর কথা; যিনি মিঠাপুকুর উপজেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তারও দায়িত্বে রয়েছেন। সরকারি এই কর্মকর্তার সিন্ডিকেডের কবলে বহু দরিদ্র পরিবার হয়েছেন নিঃস্ব, হারিয়েছেন তাদের জায়গা সম্পত্তি। ওয়াহেদের হাত থেকে রেহাই পায়নি তার পরিবরার ও আত্মীয়-স্বজন। নিজের বাবা-চাচাসহ পালিত মা-বাবার সম্পত্তি আত্মসাত করতেও বুক কাঁপেনি তার। শুধু তাই নয়, জালিয়াতি ও প্রতারণা করে সম্পতি হাতিয়ে নেওয়ার সময় ওয়াহেদ আলীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বহু পরিবার। তার এসব অপকর্মের যাবতীয় তথ্য প্রমাণাদি এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্ষমতার লোভ আর সম্পত্তির মোহ ওয়াহেদ আলীকে এতটাই অন্ধ করেছে যে, তিনি তার জন্মদাতা বাবার পরিচয়ও অস্বীকার করেন। এমনকি তার পালক বাবা-মাকে অমানুষিক নির্যাতন করে তাদের সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছেন। আপন চাচা ও বাবাকে মৃত দেখিয়ে জাল দলিলের মাধ্যমে তাদের উত্তরসূরীদের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি কুক্ষিগত করেছেন। ওয়াহেদ আলীর এসব প্রতারণা ও জালিয়াতির খবর এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
ওয়াহেদ আলীর জন্ম দরিদ্র পরিবারে। তার বাবা মৃত দসিম উদ্দিন এবং চাচা সেকেন্দার মন্ডল (দসিমের খালাতো ভাই) তৎকালীন নদীয়া জেলা (বর্তমানে কুষ্টিয়া) থেকে কাজের সন্ধানে ছোট বয়সে রংপুরের মিঠাপুকুরের শঠিবাড়ীতে আসেন। সেখানে তারা ছোটখাটো কাজ করে জীবন ধারণ করতেন। এলাকার লোকজন দসিম উদ্দিনকে ‘দসি’ এবং সেকেন্দার মন্ডলকে শারীরিক শক্তির জন্য ‘পালোয়ান’ নামে ডাকতেন।
এক সময় দসিম উদ্দিন শঠিবাড়ীর ব্যবসায়ী আব্দুল হামিদ মিয়ার গোডাউনে কুলি হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। দসিম উদ্দিনের একাধিক বিয়ের সুবাদে ওয়াহেদ আলী ছিলেন দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান। বাল্যকালে তার মা মারা যাওয়ায় শঠিবাড়ী হরিপুর গ্রামে নানাবাড়িতে গিয়ে উঠেন ওয়াহেদ আলী।
তবে পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ দেখে তার মামারা ওয়াহেদের প্রাথমিক খরচের ভার নেন। অভাবের সংসারে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ছোট বয়সেই তার মামারা বড় মির্জাপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ও নিঃসন্তান মুসলিম দম্পতি—মো. নুরু মিয়া ও স্ত্রীর হাতে ওয়াহেদকে পালকপুত্র হিসেবে তুলে দেন।
পালক বাবা নুরু মিয়ার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা
নুরু মিয়া স্বচ্ছল ছিলেন এবং তার প্রচুর জায়গা জমি ছিল। তিনি ওয়াহেদকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ দিয়ে বড় করেন এবং পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করান। নুরু মিয়ার স্বপ্ন ছিল ছেলে বড় হয়ে ওকালতি করবে। সেই লক্ষ্যে তিনি বিপুল অর্থ খরচ করে ওয়াহেদকে আইন পাস করান এবং রংপুর জেলা উকিল সমবায় সমিতিতে উকিল হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।
কিন্তু ওকালতি পেশায় যুক্ত হওয়ার পরপরই ওয়াহেদ আলীর ভয়ংকর রূপ প্রকাশ পেতে শুরু করে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইন পেশাকে হাতিয়ার বানিয়ে পালক বাবা নুরু মিয়ার সম্পত্তি আত্মসাতের ছক কষেন ওয়াহেদ। যে বাবা তাকে শূন্য থেকে পূর্ণতা দিলেন, সেই নুরু মিয়াকে জমি লিখে দেওয়ার জন্য হুমকি, ধমকি এবং মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু করেন ওয়াহেদ। এক পর্যায়ে জোরপূর্বকভাবে নুরু মিয়ার সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেন তিনি। নুরু মিয়া অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করার পর ওয়াহেদ আলীর নির্যাতন তার পালক মায়ের ওপরও অব্যাহত থাকে। শেষ বয়সে ওই বিধবা নারী ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করতে বাধ্য হন। আর সেই সময় ওয়াহেদ রংপুর শহরে বিলাসী জীবনযাপন শুরু করেন। পরবর্তীতে পালক মা-বাবার সব জমি আত্মসাৎ করে বিশাল অংকের টাকা হাতিয়ে নেন তিনি।
নিজের বাবা ও চাচাকেও ছাড় দেননি ওয়াহেদ
পালক বাবার সম্পত্তি আত্মসাৎ করার পর ওয়াহেদ আলীর নজর পড়ে রংপুরে ওকালতির সূত্রে তার মৃত বাবার আপন খালাতো ভাই সেকেন্দার মন্ডল (পালোয়ান) এবং মো. নজির উদ্দীনদের জমির ওপর। তাদের দুজনের জমি হাতিয়ে নিতে ভয়ঙ্কর জালিয়াতির আশ্রয় নেন তিনি। ওয়াহেদ আলী জালিয়াতির মাধ্যমে আদালতে সেকেন্দার মন্ডলকে মৃত ঘোষণা করেন এবং দাবি করেন যে, তার বাবা দসিম উদ্দিন এবং সেকেন্দার মন্ডল আপন ভাই। অথচ সেকেন্দার মন্ডল তখনো জীবিত ছিলেন এবং মাত্র দুই বছর আগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
এভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে নিজের বাবা, সেকেন্দার মন্ডলের সমস্ত সম্পত্তি ওয়াহেদ আলী নিজের নামে রেকর্ড করে নেন।
এমনকি বর্তমানে রংপুর-ঢাকা হাইওয়ে রোডের জমির প্রকল্পের ক্ষতিপূরণের টাকাও এই দুই নামে ইস্যু করা আছে এবং বিশ্বরোডের সাথে ১৮ শতাংশ পুকুরটি নিয়ে এখনো মামলা চলমান। ওয়াহেদ আলীর দাখিল করা মিথ্যা দলিল অনুযায়ী তার বাবা ও চাচা মৃত, কিন্তু সেকেন্দার মন্ডলের ওয়ারিশরা এখনো সেখানে বসবাস করছেন এবং ক্ষতিপূরণের ১৯ লাখ টাকা উত্তোলন করতে পারছেন না। এদের উচ্ছেদ করতে ওয়াহেদ ও তার পরিবার ১০-১২টি মিথ্যা মামলা, ঘরবাড়িতে আগুন এবং অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আদালত প্রাঙ্গণে গণধোলাই ও আইনজীবী সমিতি থেকে বহিষ্কার
সেকেন্দার মন্ডলের ওয়ারিশদের ওপর ওয়াহেদ আলীর এই অবিচার ও হয়রানিমূলক মামলার কারণে এলাকার আইনজীবীরাও অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, রংপুর কোর্টে সব আইনজীবীর সামনে ভুক্তভোগী পরিবার ওয়াহেদ আলীকে জুতা দিয়ে মারধর করে। এ ঘটনার পর আইনজীবী সমিতি তাকে সমিতি থেকে বহিষ্কার করে এবং তার ওকালতি পেশা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ওয়াহেদ আলী মিঠাপুকুর উপজেলা শিশু কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। নতুন পেশায় আসার পর থেকে নিজের বাবার পরিচয়ও গোপন রাখতেন ওয়াহেদ।
নিরীহ পরিবার উচ্ছেদ ও ‘ভয়ের রাজ্য’ স্থাপন
বাবা দসিম উদ্দিনের কিছু জমি বিশ্বরোড সংলগ্ন থাকায় ওয়াহেদ আলী তার সৎ ভাই-বোনদের (যেমন শাহ আলম, সাহেদা বেগম, কল্পনা) এবং সৎ মাকে সাথের হাত মিলিয়ে এলাকার অন্যান্য নিরীহ পরিবারকে উচ্ছেদের ছক কষেন। এলাকার কাশেম, সেকেন্দার মন্ডল, তবজাল, তবারক ও নজীরসহ মোট চারটি পরিবারকে মিথ্যা মামলা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে উচ্ছেদ করার অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে তিনটি পরিবার ইতোমধ্যেই উচ্ছেদ হয়ে চলে গেছে। এখন শুধু সেকেন্দার মন্ডলের পরিবার টিকে আছে। অভিযোগ উঠেছে, যেখানে সেকেন্দার মন্ডলের সাড়ে সাত শতক জমি ছিল এবং তার পরিবার বসবাস করতো, সেই জায়গা থেকে তাদের অমানবিকভাবে উচ্ছেদ করে দেওয়া হয়েছে। ওয়াহেদ আলী ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নিজ সৎভাই শাহ আলমকে সেখানে ঘর করে দিয়েছেন এবং সেকেন্দার মন্ডলের পরিবার এখন পাশেই অন্যের জমিতে ঘর করে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। নজির ও তার পরিবারকেও একইভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, উচ্ছেদকৃত পরিবারগুলোর সম্পত্তি জবরদখল করে ওয়াহেদ আলী সেখানে নিজের স্বজনদের পুনর্বাসন করেছেন। বর্তমানে নজির, তবজাল, তবারক এবং কাশেমের জায়গায় ওয়াহেদ আলীর বোন শাহেদা, কল্পনা, তার সৎমা এবং বড় বোন জাহেদা বাড়ি করে বাস করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন এলাকাবাসী জানান, ওয়াহেদ আলী দিনে মানুষের ভয়ে নিজ গ্রামের বাড়িতে আসতে পারেন না। এলাকাবাসীর ক্ষোভ এতটাই বেশি যে, তিনি মিঠাপুকুর থেকেই রিমোট কন্ট্রোলের মতো তার সৎ ভাই-বোনদের দিয়ে মামলা হামলা নিয়ন্ত্রণ করেন। মানুষ মিথ্যা মামলার ভয়ে তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পায় না। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সন্ত্রাসী ভাড়া করে সেকেন্দার মন্ডলের পরিবারকে এখনো মারধর ও হয়রানি করে চলেছেন।
এছাড়া যাদের সম্পত্তি একসময় বিশ্বরোডের শোরুমসহ মূল্যবান জায়গায় ছিল, তারা আজ সর্বস্বান্ত। নজীর, কাসেম, তবজাল ও তবারকদের পরিবারকে ইতোপূর্বে অনেকভাবে ভয়ভীতি, হয়রানি ও নির্যাতন করে এই জমি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে এবং অনেকেই আত্মহত্যা পর্যন্ত করেছেন বলে অভিযোগ।
সরকারি কর্মকর্তা ওয়াহেদ আলীর বিরুদ্ধে একাধিক সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি এখনো কীভাবে তার পদে বহাল আছেন, তা নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভ ও প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। সেই সাথে যথযাথ তদন্তের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।