
২০০ শয্যাবিশিষ্ট রংপুর বিভাগীয় মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প রংপুর থেকে লালমনিরহাটে স্থানান্তরের উদ্যোগের বিরুদ্ধে এবার প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠি দিয়েছেন রংপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম। গত ৬ অক্টোবর রংপুর জেলা পরিষদের প্যাডে তিনি এ চিঠি দেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে চিঠিটির গ্রহণকৃত অনুলিপি প্রতিবেদকের হাতে আসে।
চিঠিতে অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী কেন্দ্রটি রংপুর জেলার সদর উপজেলায় বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
চিঠিতে সাইফুল ইসলাম উল্লেখ করেন, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুর—এই আটটি জেলা নিয়ে রংপুর বিভাগ গঠিত। ভৌগোলিক অবস্থান ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে রংপুর বিভাগীয় শহর থেকে এসব জেলার মানুষের যাতায়াত তুলনামূলক সহজ। ফলে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার রোগীরা চিকিৎসাসেবা নিতে রংপুর শহরে আসেন।
তিনি বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন ‘০৭টি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপিতে রংপুর বিভাগীয় কেন্দ্রটি রংপুর জেলার সদর উপজেলার নির্ধারিত মৌজায় স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে ১০ একর জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রমও চলমান।
চিঠিতে আরও বলা হয়, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী তরুণ ও যুবসমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে সরকারি উদ্যোগে আধুনিক মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ জরুরি। কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, প্রকল্পটির স্থান পরিবর্তন করে লালমনিরহাটে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
সাইফুল ইসলামের মতে, লালমনিরহাট রংপুর বিভাগের এক প্রান্তে অবস্থিত হওয়ায় দিনাজপুর, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, রংপুর ও কুড়িগ্রামের রোগী এবং তাঁদের পরিবারের যাতায়াতে অতিরিক্ত ভোগান্তি তৈরি হতে পারে। এতে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবা গ্রহণও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে অনুমোদিত ডিপিপি অনুযায়ী কেন্দ্রটি রংপুর জেলাতেই নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
প্রকল্পটির স্থান পরিবর্তন নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর একটি ডিও লেটারকে কেন্দ্র করে। লালমনিরহাটে কেন্দ্রটি স্থাপনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ওই চিঠি দেওয়ার পর প্রকল্পের স্থান পরিবর্তনের উদ্যোগ সামনে আসে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের উন্নয়ন-৩ শাখা থেকে পরিকল্পনা বিভাগের ভৌত কাঠামো বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, রংপুরের নির্ধারিত স্থানে প্রস্তাবিত ১০ একর জমি তিন ফসলি হওয়ায় জমির মালিকেরা লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। ফলে জমি অধিগ্রহণে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু লালমনিরহাটে কেন্দ্রটি স্থাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার দিয়েছেন। সেখানে লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ী ইউনিয়নের বৈরাগীকুমার মৌজায় ৯ দশমিক ২৯ একর এবং নওদাবস মৌজায় শূন্য দশমিক ৭১ একর জমির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত স্থান পরিবর্তন করা হলে প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধন করতে হবে। এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে পূর্বানুমোদন দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর গত ৬ অক্টোবর প্রকল্পটি লালমনিরহাটে স্থানান্তরের উদ্যোগের বিরোধিতা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন রংপুর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
চিঠিতে তিনি বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে রংপুর বিভাগীয় শহরটি বিভাগের আট জেলার মানুষের জন্য তুলনামূলক সহজগম্য। অন্যদিকে, লালমনিরহাট বিভাগের এক প্রান্তে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে কেন্দ্রটি স্থাপন করা হলে নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের মতো দূরবর্তী জেলার মাদকাসক্ত রোগী এবং তাঁদের পরিবারের চিকিৎসাসেবা গ্রহণে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হবে। তাঁদের ভোগান্তিও বাড়বে।
প্রতিমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, রংপুরে ইতোমধ্যে ১০ একর জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তাই স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। জনস্বার্থ, ভৌগোলিক সুবিধা ও অনুমোদিত ডিপিপি বিবেচনায় কেন্দ্রটি রংপুর জেলার সদর উপজেলার মন্থনা মৌজাতেই বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানান তিনি।
এদিকে, ত্রাণমন্ত্রী ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর ডিও লেটার এবং এ-সংক্রান্ত চিঠিপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রকল্পটি রংপুর থেকে লালমনিরহাটে স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়ে রংপুরের বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, বিভাগীয় শহরের জন্য অনুমোদিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান অন্য জেলায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলে বিভাগের অধিকাংশ জেলার মানুষকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণে বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হবে। তাঁরা অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী রংপুরেই কেন্দ্রটি নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে রংপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, “ডিপিপিতে অনুমোদিত এই প্রকল্পটি রংপুর বিভাগীয় শহরেই হতে হবে। এ জন্য আমি ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছি। আমাদের মাননীয় জেলা মন্ত্রীও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ত্রাণমন্ত্রীর ডিও লেটার বাতিলের জন্য চিঠি দিয়েছেন। আশা করি, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি রংপুরে নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেবেন।”
প্রকল্পটির স্থান পরিবর্তন নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে এখন তাকিয়ে রয়েছেন রংপুরের মানুষ।