
ব্র্যান্ডের পোশাকের দোকানে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ের ঘোষণা থাকলেও খুব একটা ক্রেতার দেখা নেই। টানা কয়েক বছর প্রায় দুই অঙ্কের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের কেনার সামর্থ্য এখন বেশ তলানিতে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই শেষ হয়েছে পূজার কেনাকাটাও।
এ ছাড়া দেশজুড়ে জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বাজার, শপিং মল ও দোকান এখন খোলা রাখা যাচ্ছে সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। আগে অন্তত রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকত। ফলে কাজ শেষে মানুষ সাধারণত যে সময়ে কেনাকাটা করতে বের হন, সেই সন্ধ্যা-রাতের মূল সময়টাই এখন হাতছাড়া হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তাদের বিক্রি অন্তত ২০ শতাংশ কমেছে।
রাজধানীর বনানীর সায়মা ফ্যাশন আউটলেটের ব্যবস্থাপক মো. সাফিন বলেন, ‘এখন যে তাকগুলো পোশাকে ঠাসা দেখছেন, গত বছর ছাড় শুরুর পর এই সময়ে সেগুলো প্রায় খালি হয়ে গিয়েছিল।’
শালোয়ার-কামিজ, শাড়ি, লেহেঙ্গার মতো নারীদের পোশাক বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি। শহরে এর কয়েকটি শাখা রয়েছে। সাফিন বলেন, ‘গত বছর এই সময়ে আপনার সঙ্গে কথা বলার সময়ই পেতাম না। এবার অবস্থা ভিন্ন। ক্রেতা হাতেগোনা।’
তার হিসাবে, গত বছরের তুলনায় বিক্রি কমেছে ৩০ শতাংশ।
সাফিনের ভাষ্য, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং এর জের ধরে হঠাৎ জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে ব্যবসার পরিবেশ যেমন ঘোলাটে হয়েছে, তেমনি ক্রেতাদের আস্থাতেও সংকট তৈরি হয়েছে। দোকান খোলা রাখার সময় কমে যাওয়ার কারণেও বিক্রি কমেছে বলে জানান তিনি।
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড রঙ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী সৌমিক দাস বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলার কারণে মানুষ গত বছরের মতো কেনাকাটা করছে না।
২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখনো চলছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে গড় বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরেই আছে, অথচ মজুরি বেড়েছে তার চেয়ে কম হারে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একইসঙ্গে প্রকৃত জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসবে বলেও জানিয়েছে তারা।
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মিলিয়ে এর অর্থ দাঁড়ায়, নতুন কর্মসংস্থান কমবে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে এবং মানুষের আয় কমবে।
সৌমিক দাস বলেন, ‘গত বছর ছাড়ে যে সাড়া পেয়েছিলাম, এবার সেটি মিলছে না। গত বছরের চেয়ে ক্রেতার আনাগোনা অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা ছাড়ে কেনাকাটা করছেন, তারাও শুধু নির্দিষ্ট প্রয়োজন মেটাচ্ছেন। প্রয়োজনের বেশি কিনছেন না। আগে ছাড় চললে অনেকে দরকারের চেয়ে বেশি কিনে ফেলতেন।’
অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি আবহাওয়া পরিস্থিতিও ক্রেতাদের মনোভাব বদলে দিয়েছে। নভেম্বরের শুরুতে তাপমাত্রা কমলে সাধারণত শীতের আগমনী বার্তা মেলে। এবার তা হয়নি। বর্তমান আবহাওয়ায় অবস্থা এমন, যা গরম বা শীত, নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমের পোশাকের জন্য উপযুক্ত না। ফলে দোকানে কী সাজানো হবে, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন বিক্রেতারা।
পোশাক ব্র্যান্ড এমব্রেলার কর্মকর্তারা বলছেন, টি-শার্ট ও পোলো শার্টের মতো গ্রীষ্মের পোশাকে ছাড় দেওয়ার পরও খুব একটা চাহিদা নেই। প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের প্রধান কাজী মাকতুম শোভন বলেন, ‘আমাদের বিক্রি প্রত্যাশার চেয়ে কম হয়েছে।’
রাত ৮টায় দোকান বন্ধের নিয়মকেও একটি কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। শোভন বলেন, ‘কয়েক দিন আগে দুর্গাপূজা শেষ হয়েছে, ঈদও সামনে। এ কারণে আমরা প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছি না।’
আগামী কয়েক মাসেও বিক্রি লক্ষ্যমাত্রার কিছুটা নিচে থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
ফ্যাশন ব্র্যান্ড রাইজের সহকারী ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মুক্তার হোসেনও একই কথা বলেন। তার ভাষ্য, শীতের আগের ছাড়ে এবার গত বছরের মতো বিক্রি হয়নি।
হোসেন বলেন, ‘গত অক্টোবরে ছাড় দিয়ে আমরা প্রায় ২০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছিলাম। এবার তা নেমে এসেছে ১৫ লাখ টাকায়।’ এর জন্য তিনি অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে, বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করেন।
তিনি বলেন, ‘এ মৌসুমে ক্রেতার উপস্থিতি অর্ধেকে নেমে এসেছে। যারা আসছেন, তাদের মধ্যেও কেনাকাটা করছেন হাতেগোনা কয়েকজন।’
আরেক লাইফস্টাইল ও ফ্যাশন ব্র্যান্ড ক্যাটস আইয়ের অনলাইন সেলস এক্সিকিউটিভ সাজ্জাদ হোসেন জানান, গত বছরের তুলনায় তাদের বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। তিনি বলেন, ‘সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল নয়। তাই ক্রেতারা অপেক্ষা করছেন সামনে কী হয়। এ কারণে তারা কেনাকাটাও কম করছেন।’
এদিকে রাজধানীর নিউমার্কেটের ব্র্যান্ডবিহীন পোশাকের দোকানগুলো গত সপ্তাহেও শীতের নতুন পণ্য তোলেনি। কেউ কেউ পুরোনো মজুত ছাড় দিয়ে বিক্রির চেষ্টা করছিলেন।
স্থানীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর সংগঠন ফ্যাশন এন্ট্রাপ্রেনিউয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের অর্থ পরিচালক সানাউল হক বাবুল ডেইলি স্টারকে জানান, মৌসুমের শেষ দিকে বিক্রি বাড়াতে এই সময়টায় পণ্যে ছাড় দেওয়া ব্যবসায়ীদের চিরাচরিত রেওয়াজ।
তিনি জানান, এবার দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চাহিদার ওপর চাপ ফেলছে। ফলে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।