
রংপুরের আটটি উপজেলায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দেশব্যাপী বিদ্যমান সার সংকট নিরসনে সরকারের গৃহীত এই উদ্যোগটি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে চরম স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দৈনিক যুগান্তর-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র সামনে এসেছে।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, নীতিমালা উপেক্ষা করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নামে এসব ডিলারশিপ বিতরণ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলারদের অর্ধেকেরও বেশি সরাসরি দলীয় পদের অধিকারী অথবা হেভিওয়েট রাজনৈতিক নেতাদের নিকটাত্মীয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিএনপির উপজেলা কার্যালয়কেই সার ডিলারের অফিস ও গোডাউন হিসেবে নথিপত্রে দেখানো হয়েছে।
পীরগঞ্জের ১৫টি ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশই স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের দায়িত্বশীল নেতা বা তাদের স্বজন:
উপজেলা নেতাদের স্বজন: পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপি সভাপতি মাহমুদুন্নবী চৌধুরী পলাশের স্ত্রী (ফাহিমা আক্তার খানম), পীরগঞ্জ সদর বিএনপি সভাপতি মামুনুর রশিদ বাদলের স্ত্রী (শাহানা খানম), পৌরসভা বিএনপি সভাপতি সাইফুল আজাদ মণ্ডলের স্ত্রী (লাকি বেগম) এবং মিঠিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়কের স্ত্রী ডিলারশিপ পেয়েছেন।
জেলা নেতাদের স্বজন: জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. সাইফুল ইসলামের ভাতিজা (মাজহারুল আনোয়ার) এবং বোন জামাই (মো. নুরুজ্জামান) ডিলারশিপ বরাদ্দ পেয়েছেন।
দলীয় কার্যালয় গোডাউন: ৫ নম্বর পাঁচগাছী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. ইকরামুল হক ‘মেসার্স আজমল ট্রেডার্স’-এর নামে ডিলারশিপ নিয়েছেন, যেখানে তিনি ডিলারের গোডাউন হিসেবে বিএনপি কার্যালয়কে দেখিয়েছেন।
অন্যান্য ডিলার: এছাড়া ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায় এবং যুবদলের শীর্ষ নেতারা (যেমন- ১, ৩, ৪, ৭, ১০, ১৩, ১৪ ও ১৫ নম্বর ইউনিয়নের বর্তমান ও সাবেক বিএনপি/যুবদল সভাপতি) স্ব নামে ডিলারশিপ পান।
উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের সবকটিতেই দলীয় প্রভাবের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন:
নেতাদের স্ত্রী ও সন্তান: উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্ত্রী (সুলতানা ফেরদৌসি), সহসভাপতির ছেলে, সাধারণ সম্পাদকের শ্বশুর এবং সাধারণ সম্পাদকের ফুফাতো ভাই।
শিক্ষার্থীর নামে বরাদ্দ: অন্নদানগর ইউনিয়নের সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে জয়িতা আক্তার জিনি ডিলারশিপ পেয়েছেন, যিনি দিনাজপুর সরকারি কলেজের ৪র্থ বর্ষের (বাংলা) একজন শিক্ষার্থী।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে স্থানীয় বিএনপি সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও দলীয় শীর্ষ নেতাদের আত্মীয়দের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে:
উপজেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বজন: উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোতাহারুল ইসলাম নিক্সন পাইকারের স্ত্রী (রেহেনা পারভীন), উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানীর ভাই (আল আমিন সরকার) এবং তার খালাতো ভাই (মিরাজ আহমেদ)।
ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ: খোড়াগাছ, ভাংনী, কাফ্রিখাল, বালুয়া মাসিমপুর, বড়বালা, মিলনপুর, মির্জাপুর ও ইমাদপুর ইউনিয়নের বিএনপি সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক অথবা তাদের সন্তানরা ডিলারশিপ পেয়েছেন।
উপজেলা সভাপতির পরিবার: উপজেলা বিএনপির সভাপতি চাঁদ সরকারের স্ত্রী (মোসলেমা বেগম) গঙ্গাচড়া সদরে এবং তার ভাগিনা (মশিউর রহমান) নোহালী ইউনিয়নে ডিলারশিপ লাভ করেছেন।
সাধারণ সম্পাদকের পরিবার: উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আলীর স্ত্রী (রুজিনা) বড়বিল ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন।
অন্যান্য নেতাকর্মী: জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শরীফ নেওয়াজ জোহার মা (জহুরা বেগম), উপজেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক (গোলাম রব্বানী) এবং ইউনিয়ন যুবদল ও বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা ডিলারশিপ পেয়েছেন।
এছাড়াও রংপুর সদর, বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, কাউনিয়া এবং রংপুর মহানগর ও বিভিন্ন পৌরসভার এলাকাগুলোতেও একইভাবে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় ক্ষোভ প্রকাশ
সম্প্রতি রংপুর জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় এ বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। সভায় রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী বলেন:
”ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ‘বানরের পিঠা ভাগের মতো’ বণ্টন করা হয়েছে। এটি দলীয়করণের একটি লজ্জাজনক উদাহরণ। নীতিমালার বাইরে গিয়ে এভাবে স্বজনপ্রীতি করায় সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য ভেস্তে যেতে বসেছে।”
এ বিষয়ে সাইফুল ইসলাম (জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক) সকল দায় প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে বলেন, “এর সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তারাই সরাসরি জড়িত। কারা কীভাবে ডিলারশিপ পেয়েছে, তা কেবল সরকারি কর্মকর্তারাই বলতে পারবেন।”
ইসরাত জাহান (জেলা প্রশাসক, রংপুর): তিনি জানান যে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা ছিল সীমিত। তিনি উল্লেখ করেন, “সার ডিলার নিয়োগের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পন্ন করেছে। নীতিমালা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতি ইউনিয়নের জন্য উপজেলা কমিটির বাছাই করা তিনটি করে প্রস্তাবিত নামের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকেই কৃষি মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদন করে নিয়োগ নিশ্চিত করেছে।”
সার সংকটের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং কৃষকবান্ধব একটি সংকট নিরসনে সরকারের উদ্যোগ থাকলেও, মাঠপর্যায়ে নীতিমালা লঙ্ঘন, ব্যাপক স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক দলীয়করণের কারণে রংপুর অঞ্চলের কৃষিখাত এখন নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।