
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের আগে আরও সময় নিতে চায় বিএনপি। অন্যদিকে, আসন্ন দুর্গাপূজা ঘিরে সারা দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটি বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শুরু হওয়া বৈঠক চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। এতে সভাপতিত্ব করেন তারেক রহমান।
দলীয় সূত্র জানায়, বৈঠকে মূলত আসন্ন দুর্গাপূজার নিরাপত্তা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন—এই দুই এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা হয়। পূজাকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য দলের নেতাকর্মীদের নিজ নিজ এলাকায় সজাগ থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে আলোচনায় উঠে আসে, একটি গোষ্ঠী দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করতে পারে। এসব দুষ্টু লোক দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের পাঁয়তারা করছে। তাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের যে কোনো অপচেষ্টা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি বিএনপির নেতাকর্মীদের সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। যাতে দেশের কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। এ সময় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ নেতাদের নিজ নিজ এলাকার পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও পূজার সার্বিক সহযোগিতায় অংশ নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
দলীয় সূত্র আরও জানায়, পূজামণ্ডপে হামলা, নাশকতা কিংবা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির কোনো সুযোগ রাখতে চায় না বিএনপি। এ জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মন্দিরভিত্তিক কমিটি গঠন করে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক নজরদারি বা পাহারা নিশ্চিত করার বিষয়েও জেলার নেতাদের এরই মধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে বৈঠকের আলোচনায় উঠে আসে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা
স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। দলীয় সূত্র জানায়, এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী ও ইসমাইল জবিউল্লাহ সম্প্রতি জেলা, মহানগর, উপজেলা ও পৌরসভার শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত অনলাইনে জুম মিটিংয়ের বিষয়বস্তু দলের চেয়ারম্যানের কাছে তুলে ধরেন। শুধু ঢাকা বিভাগের নেতাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি বলেও জানিয়েছেন তারা। শিগগিরই এই বিভাগের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করা হবে বলে সূত্র জানায়।
দলীয় সূত্রমতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি। যাতে সবাই যার যার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে। এবার দলীয় প্রতীক না থাকায় একই পদে দলের একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। এতে দলীয় ভোট বিভক্ত হওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিভেদ ও কোন্দল বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সম্ভাব্য বিরোধগুলো আগেভাগে আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসার নির্দেশনা দিয়েছেন তারেক রহমান।
বৈঠকে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা হয়। সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আগামীকাল সোমবার দিনক্ষণ ঘোষণার বিষয়টি আলোচনায় উঠলে তখন কয়েকজন সদস্য বলেন, ইসিকে সরকারের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দায়িত্ব প্রদান করা হয়নি৷ তাদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার এখতিয়ার নেই।
স্থায়ী কমিটির সদস্যরা মনে করেন, সারা দেশে বিনাভোটের চেয়ারম্যান, মেয়র, কাউন্সিলর ও মেম্বার সবাই পালিয়ে গেছে৷ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে এই অচলাবস্থা কাটিয়ে কাঠামোকে কার্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কিছুটা সময় প্রয়োজন। তবে যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পক্ষেও মত দেন কয়েকজন নেতা। তাদের মতে, নির্বাচন আয়োজনের আগে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি গুছিয়ে নেওয়া জরুরি।
বৈঠক শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সভায় আসন্ন দুর্গাপূজায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করা এবং সার্বিকভাবে তারা যেন দুর্গাপূজার উৎসবে শামিল হয়ে আনন্দ ভাগ করে নিতে পারেন, তা নিয়ে নেতৃবৃন্দ আলোচনা করেন। দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে সারা দেশের পূজামণ্ডপগুলোতে স্থানীয় পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে বিএনপির নেতাকর্মীরা স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা পালন করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, নানাভাবে দেশের বিরুদ্ধে, গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের নীলনকশা কেউ কেউ করছেন। সব ধরনের অপপ্রচার, অপকীর্তি এবং ষড়যন্ত্রকে সরকার দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে, দক্ষ পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিহত করতে সক্ষম হবে এবং আমাদের দলের নেতাকর্মীরা এ বিষয়ে সদা সতর্ক থাকবেন। তারা ঘুমহীন প্রহরীর মতো প্রতিটি পূজামণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা পালন করবেন এবং প্রহরীর ভূমিকা পালন করবেন। এ বিষয়ে করণীয় এবং ইতোমধ্যে আমরা কী করেছি, সেসব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
রিজভী বলেন, ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি দুর্গাপূজা পর্যবেক্ষণ কমিটি করা হয়েছে। এর আগেও আমরা বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছি। আমরা এ বিষয়ে অত্যন্ত কনসার্ন। আমরা প্রত্যেকে সজাগ আছি।
বৈঠকে সাংগঠনিক বিষয় নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে বলে জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। তিনি বলেন, আমাদের পরবর্তী করণীয় কী, কীভাবে সাংগঠনিক তৎপরতা আরও বৃদ্ধি করব ইত্যাদি নিয়ে আমাদের নেতৃবৃন্দ আলোচনা করেছেন।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, রুহুল কবির রিজভী, আমান উল্লাহ আমান, অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ও ইসমাইল জবিউল্লাহ।