
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে মাদক সেবন ও বিক্রির প্রবণতা। উঠতি বয়সী কিশোরদের একটি অংশও ধীরে ধীরে মাদক সেবন ও কারবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।নিজেদের আড়ালে রাখতে মাদক কারবারিরা অনেক সময় কিশোরদের ব্যবহার করছে। এতে ধ্বংসের মুখে পড়ছে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে শতাধিক ব্যক্তি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে কিশোরগঞ্জ ইউনিয়নে ২৬ জন, বাহাগিলীতে ১০ জন, নিতাইয়ে ২৩ জন, পুটিমারীতে ১৫ জন, বড়ভিটায় ৮ জন, রনচন্ডীতে ৪ জন, গাড়াগ্রামে ১০ জন, মাগুড়ায় ১৪ জন এবং চাঁদখানায় ৯ জনের নাম স্থানীয়ভাবে উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা ও আঞ্চলিক যোগাযোগপথ ব্যবহার করে কিশোরগঞ্জে মাদকের চালান প্রবেশ করছে। তাদের তথ্যমতে, বুড়িমারী-ডালিয়া হয়ে কিশোরগঞ্জ, গঙ্গাচড়ার মহিপুর ব্রিজ হয়ে, বাংলাবান্ধা থেকে নীলফামারীর জাদুরহাট হয়ে এবং হিলি-পার্বতীপুর হয়ে মাদক আসার অভিযোগ রয়েছে।
মাদক পরিবহনে অভিনব কৌশল ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। কখনো মধু বিক্রির আড়ালে, কখনো খেলনা সামগ্রীর সঙ্গে, আবার কখনো যানবাহনের বডি কিংবা ব্যক্তির শরীরে লুকিয়ে মাদক পরিবহন করা হয় বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
মাদকসেবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকায় বিভিন্ন ধরনের মাদক পাওয়া যাচ্ছে। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, স্কার্ফ সিরাপ ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা, ইয়াবা প্রতি পিস ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, হেরোইন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা এবং ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট প্রায় ২০০ টাকা দরে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। গাঁজার দামও ২০০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত বলে জানিয়েছেন তারা।
প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকার মাদক কেনাবেচা হয়ে থাকে। সন্ধার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত
মাদক বিক্রির কয়েকটি পয়েন্ট কিশোরগঞ্জ মিনি স্টেডিয়াম, কলেজ মাঠ, চেংমারী ব্রিজ, কেশবা নদীর পাড়, ইসমাইল-সিরাইডাঙ্গা ব্রিজ সংলগ্ন ধান ক্ষেত,ফকিরপারার সাইট ক্যানেল, নিতাইয়ের কাচারী বাজারের বেলতলী, মৌলভীবাজারের চোচপাড়ার বাঁশের তল, বাংলাবাজার স্কুল মাঠ, পারেরহাট সংলগ্ন কলাবাগান, বড়ভিটার ঈদগাহ মাঠসহ বাজার পার্শবর্তী ফাঁকা জায়গা ও নিজেদের বাড়িতে গোপনে মাদক বিক্রি করে আসছেন কারবারিরা।
ছাদুরারপুল বাজারের বীজ ব্যবসায়ী মামুন বলেন, পরিবেশ বলা চলে ভয়াবহ। মাদক আমাদের যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কী বলবো ভাই, ভয়ে আমার ছেলেকে রংপুরে পাঠিয়ে দিয়েছি। ১২ থেকে ১৪ বছরের ছেলেরাও মাদকে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। পরিবারে অশান্তি, ঝগড়া এমনকি বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনাও ঘটছে। সরকার ও প্রশাসনের উচিত মাদক বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
কাচারী বাজারের এক মুদি ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাদকের কারণে এলাকায় নানা ধরনের অপরাধ বাড়ছে। প্রশাসন দু-একজনকে ধরলেও কয়েকদিন পর তারা বের হয়ে আসে আবার ব্যবসা শুরু করে—এমন অভিযোগ রয়েছে। স্হানীয় চকিদাররা কমিশন খায় প্রশাসন চাইলে কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে মাদক বিক্রি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি,মাদক বিস্তারের মূল কারন প্রশাসনের দুর্বলতা।মাদকের ভয়াবহতা থেকে কিশোরগঞ্জের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা, মাদকের সরবরাহ বন্ধ এবং নিয়মিত অভিযান জোরদার করা জরুরি।
কিশোরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, কিশোরগঞ্জে মাদকের বিস্তার রোধে এখনই কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ জরুরি। গ্রেফতারের পর দ্রুত জামিনে বের হয়ে কেউ যেন পুনরায় মাদক ব্যবসায় জড়াতে না পারে, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা দরকার। মাদকের মূল হোতা ও পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় এনে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টায় মাদক নির্মূল করতে হবে। কারণ আজকের তরুণ সমাজকে রক্ষা করাই আগামী দিনের নিরাপদ কিশোরগঞ্জ গড়ার প্রধান শর্ত।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আঃ গফুর বলেন,মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান নিয়মিতভাবে চলছে। মাদক কারবারিদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে মাদক উদ্ধার ও সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা হবে এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।