
কাউনিয়ায় শিক্ষা কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক উদাসীনতায় নাজুক মাধ্যমিক শিক্ষা পাঠদানে অবহেলায় বাড়ছে কোচিং নির্ভরতা
মোঃ সাইফুল ইসলাম, নিজস্ব প্রতিবেদক :একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সর্বজনীন ও সাশ্রয়ী করে তুলতে হলে শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান অপরিহার্য। কিন্তু রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার চরম তদারকহীনতা, প্রশাসনিক শিথিলতা ও দায়িত্বহীনতার কারণে গোটা মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। সরকারি নজরদারি না থাকায় উপজেলার অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকহারে কমছে। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান না হওয়ায় কোচিং সেন্টারের ওপর শিক্ষার্থীদের নির্ভরতা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
স্থানীয় ও অভিভাবকদের অভিযোগ, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে নিয়মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বা ঝটিকা নজরদারি চালানো হয় না। কর্মকর্তার প্রশাসনিক অদক্ষতার সুযোগে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা সময়মতো উপস্থিত হন না। নির্ধারিত সময় পার হলেও পাঠদান শুরু না হওয়ার নজির রয়েছে হরহামেশাই। ফলে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে এবং শ্রেণি কার্যক্রমে অনুপস্থিতির হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
শ্রেণিকক্ষে নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান না পেয়ে ভালো ফলাফল ও জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রত্যাশায় শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারমুখী হতে বাধ্য হচ্ছে। উপরন্তু, একশ্রেণির শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ফাঁকি দিয়ে পরোক্ষভাবে শিক্ষার্থীদের নিজেদের প্রাইভেট বা কোচিংয়ে যেতে বাধ্য করছেন। এতে শিক্ষার্থীদের ওপর যেমন বাড়তি মানসিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত অভিভাবকরা। সামর্থ্যের অভাবে অনেকে সন্তানকে কোচিংয়ে পাঠাতে না পারায় শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হয়ে পিছিয়ে পড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, “উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতা ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণেই আজ আমাদের এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থার এই নাজুক দশা। শ্রেণিকক্ষে যদি সঠিক পাঠদান নিশ্চিত করা হতো, তবে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে আমাদের কোচিংয়ে দৌড়াতে হতো না।”
দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করে কাউনিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, “তদারকির ঘাটতির বিষয়টি সঠিক নয়। লোকবল সংকট ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার কারণে মাঝেমধ্যে নিয়মিত পরিদর্শনে কিছুটা বিঘ্ন ঘটে। তবে কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে অবহেলা বা কোচিংমুখী করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রংপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এনায়েত হোসেন বলেন, “জনবল সংকটের কারণে পীরগাছা উপজেলায় মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। তাকে সপ্তাহে দুই দিন সেখানে যেতে হয়। এ ছাড়া আমাদের বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো কখনো জেলার আটটি উপজেলাতেও যেতে হয়।
শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির বিষয়টি আপনারা গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছেন, এটি অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। বিষয়টি আমরা বুঝতে পারছি এবং শিক্ষার্থীরা যাতে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে, সে জন্য আমরাও সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করছি। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানা জানান, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি বাড়ানো প্রশাসনের অগ্রাধিকার। মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বে কোনো গাফিলতি আছে কি না এবং কোচিং নির্ভরতা কেন বাড়ছে—তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। অনিয়মে জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি খুব শিগগিরই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঝটিকা পরিদর্শনের আশ্বাস দেন।
এদিকে মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় দ্রুত শৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে রংপুর জেলা শিক্ষা অফিসারসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয়রা।