
নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলায় গ্রাহকের প্রায় কোটি টাকা নিয়ে গা ঢাকা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সোনালী ব্যাংক শাখার নৈশ প্রহরী ফিরোজ মিয়ার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ব্যাংক পাড়ায় গ্রাহকদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ওই নৈশ প্রহরী লাপাত্তা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপক পংকজ কান্তি রায়। তবে আত্মসাৎ হওয়া টাকার পরিমাণ নিশ্চিত করেননি তিনি। এই ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে (জিডি নম্বর ১৪৯১) বলেও জানান এই ব্যাংক কর্মকর্তা।
গ্রাহকদের অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ইসমাইল গ্রামের কছির উদ্দিনের ছেলে ফিরোজ মিয়া গত ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে সোনালী ব্যাংক শাখার নৈশ প্রহরী হিসাবে কর্মরত ছিলেন। নৈশ প্রহরী পদে থাকলেও ফিরোজ মিয়া অফিস চলাকালে ব্যাংকের গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট খোলা, লোনের ফাইল সাজানো, টাকা জমা ও উত্তোলন করাসহ যাবতীয় কাজে গ্রাহকদের সহযোগিতা করতেন।
এভাবে দিনের পর দিন কাজ করার ফলে সে গ্রাহকদের বিশ্বস্ত হয়ে উঠে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যাংকে কর্মরত অলস ফাঁকিবাজ ও দুর্নীতিবাজ ব্যাংকাররা নিজের দায়িত্ব ভুলে গিয়ে ফিরোজকে দিয়ে ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করিয়ে নেন। সেই থেকে নৈশ প্রহরী ফিরোজ হয়ে উঠেন সর্বসেবা। গ্রাহকদের ধারণা ছিল ফিরোজ যা করবে তাই হবে। সে কারণেই গ্রাহকরা সময় ব্যয় না করে ফিরোজের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ লেনদেন করতেন।
এ নিয়ে ব্যাংকে সেবা নিতে আসা গ্রাহক ছাদিকুল মিয়া বলেন, সোনালী ব্যাংকে লোন করতে আসলে আগে ফিরোজের সঙ্গে কথা বললে হত। ফিরোজ যার বিষয়ে ম্যানেজার বা অন্যান্য কর্মকর্তাদের সুপারিশ করতেন তার কাজ আগে হত। এমনকি ফিরোজ ব্যাংকে লোন করতে আসা শিক্ষক, ব্যাবসায়ী, ঠিকাদার, কৃষকসহ সবার কাছ থেকে ব্যাংকে লোন করে দেওয়ার কথা বলে ফাঁকা চেক বইয়ের পাতা, জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি, অলিখিত স্ট্যাম্প ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি নিয়ে রাখতেন।
তিনি দাবি করে বলেন, পরবর্তীতে সেসব গ্রাহকের নামে মোটা অংকের লোন পাশ করে নিয়ে তাদেরকে নাম মাত্র টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিদায় দিতেন। কয়েক বছর পর ব্যাংক থেকে নোটিশ গেলে তারা লোনের পরিমাণ দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন। কিন্তু তাদের আর কিছুই করার থাকে না। বাধ্য হয়ে জমি জায়গা ঘরবাড়ি বিক্রি করে ব্যাংকের লোন পরিশোধ করতে বাধ্য হন গ্রাহকরা। সঠিক তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেড়িয়ে আসবে। শুধু নৈশ প্রহরী ফিরোজ নয় ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা এ ঘটনায় জড়িত।
সোনালী ব্যাংকের গ্রাহক তহুরা (তহুজা) বেগম বলেন, আমি সোনালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ শাখায় একটি এফডিআর করেছিলাম। এফডিআরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর আমি ব্যাংকে টাকা উত্তোলন করতে গিয়েছিলাম। নৈশ প্রহরী ফিরোজ আমাকে জানায় আপনি চেকবই দিয়ে যান আমি সবকিছু রেডি করে রাখব আপনি কয়েকদিন পরে এসে টাকা নিয়ে যান। দুই তিনদিন পর ব্যাংকে টাকা উত্তোলন করতে গিয়ে জানতে পারি আমার অ্যাকাউন্ট শূন্য। পরে বিষয়টি ম্যানেজারকে জানালে তিনি আমার টাকার দায়িত্ব নেন।
ব্যাংকের অপর গ্রাহক আরজিনা বেগম বলেন, আমি মাদ্রাসায় চাকরি করি। ফিরোজ আমার বেতনের ২৮ হাজার টাকা তুলে নিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও অভিযুক্ত ফিরোজের মুঠোফোন নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
নৈশ প্রহরী ফিরোজের বাবা কছির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, আমার ছেলে ব্যাংকের অনেক গ্রাহকের টাকা উত্তোলন করে নিয়েছে স্বীকার করে বলেন, এর মধ্যে গাড়াগ্রামের তহুড়া বেগমকেসহ কয়েকজনের ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যাংক ম্যানেজার পংকজ কান্তি রায়ের মাধ্যমে ফেরত দিয়েছি। এতগুলো টাকা আমার ছেলে কি করেছে তা আমার জানা নেই।
ফিরোজ কতগুলো টাকা নিয়েছে প্রশ্ন করলে কছির উদ্দিন বলেন, শুনেছি সবগুলো মিলে প্রায় কোটি টাকা।
কিশোরগঞ্জ সোনালী ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক পংকজ কান্তি বলেন, সোনালী ব্যাংকের নৈশ প্রহরী ফিরোজ মিয়া গত জুলাই মাসের ২০ তারিখ থেকে হঠাৎ করে ব্যাংকে আসা বন্ধ করে দেন। তার বিষয়ে খোঁজ খবর নিলে তার পরিবারের লোকজন জানান, সে জরুরি কাজে ঢাকায় গেছে। তার ব্যাবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তাকে পাওয়া না যাওয়ায় তার বাড়িতে নোটিশ পাঠানো হয়। পরবর্তীতে এই সংবাদ জানার পর সোনালী ব্যাংকের ১০ থেকে ১৫ জন আমানতকারী ব্যাংকে এসে তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা না পেয়ে বিষয়টি আমাদের জানান। ইতোমধ্যে কয়েকজন গ্রাহককে ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছি।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ থানার ওসি আব্দুল গফুর মিয়া জিডির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, কিশোরগঞ্জ সোনালী ব্যাংকের নৈশ প্রহরী গত ২০ জুলাই থেকে নিখোঁজ রয়েছে। সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার বাদী হয়ে এ ঘটনায় একটি মিসিং ডায়েরি করেছেন।