
বাবারবাবারাই পরিচয় শনাক্ত করতে এক আসামির ডিএনএ পরীক্ষা নিয়ে বিপাকে পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চাচাকে বাবা সাজিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেয়ার অভিযোগে ৮ মাস ধরে কারাগারে রয়েছেন ৩৫তম বিসিএস ক্যাডার কামাল হোসেন। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষার জন্য তার বাবা ও চাচাকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। ফলে হচ্ছে না ডিএনএ পরীক্ষাও। বিশেষজ্ঞের মতে, মুক্তিযোদ্ধা কোটার নামে প্রতারণার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
চাচাকে বাবা পরিচয় দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় প্রথমে কামাল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পড়াশোনা শেষ করে একই কোটা ব্যবহার করে হয়ে যান বিসিএস কর্মকর্তা। গ্রেফতারের আগে ৩৫তম বিসিএসের এই কর্মকর্তা নাচোল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জালিয়াতির বিষয়টি সামনে এলে প্রায় দুই বছর আগে কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলার এজাহারে বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা নিতে বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তন করেন তিনি। এর পরিবর্তে চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা আহসান হাবীব ও চাচি সানোয়ারা খাতুনকে নিজের বাবা-মা হিসেবে পরিচয় দেন কামাল।
দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন শিক্ষাসনদে তার প্রকৃত বাবা-মায়ের নামই ব্যবহার করা হয়েছিল। এরপরও প্রকৃত বাবা-মা কে, তা শতভাগ নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেয় সংস্থাটি।
দুদকের সহকারী পরিচালক তানজীর আহমেদ বলেন, ‘নিজের পিতা-মাতার স্থলে চাচাকে পিতার পরিচয় দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও চাকরি নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে; এ বিষয়ে একটি মামলা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।’
তবে ৮ মাসেও এই ডিএনএ পরীক্ষা করাতে পারেনি দুদক। নিজের ও বাবা-চাচাদের অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে অসহযোগিতা করে আসছেন কামাল। আদালতের নির্দেশ অমান্য করায় গত জানুয়ারিতে তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট দেলোয়ার জাহান রুমি বলেন, ‘সত্যিই যদি তার প্রকৃত পিতা মুক্তিযোদ্ধা হন, তাহলে নিশ্চয়ই তিনি নিজে ডিএনএ টেস্টের জন্য আবেদন করতেন। ডিএনএ টেস্ট হলে প্রমাণ হয়ে যেত, এরাই তার পিতা-মাতা। তিনি সেটা করেননি। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার যখন এটার উদ্যোগ নেয়া হলো, বারবার তিনি সেটাকে এড়ানোর জন্য বিভিন্নভাবে তদবির ও বিভিন্ন ধরনের আবেদন দিয়ে এটা বিলম্বিত করার চেষ্টা করেছেন।’
ঘটনা এখানেই শেষ নয়। ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কামালের প্রকৃত বাবা-মা এবং চাচা-চাচিকে ঢাকায় আনা যায়নি। পুলিশকে দায়িত্ব দেয়া হলেও তারাও ব্যর্থ হয়েছে। কুষ্টিয়ার পুলিশ জানায়, তাদের কাউকেই বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছে না।
অ্যাডভোকেট দেলোয়ার জাহান রুমি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট জেলার যে এসপি রয়েছেন, তাকে বাকি চারজনকে উপস্থিত করার জন্য আদেশ দেয়া হয়েছিল। সেখান থেকে প্রতিবেদন এসেছে যে, বাকি চারজন অভিযুক্তের জেলে যাওয়ার খবর পেয়ে এবং ডিএনএ টেস্টে অসহযোগিতা করার জন্য তাদের বসতঘরে তালা মেরে পালিয়ে গেছে।’
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম বলেন, ডিএনএ পরীক্ষা করা না গেলেও বিদ্যমান নথিপত্রের ভিত্তিতেই দ্রুত চার্জশিট দেয়া সম্ভব। কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এগুলোকে হালকাভাবে ছেড়ে দেয়া মোটেও উচিত নয়। আমরা অতীতে দেখেছি, দু-একটি ক্ষেত্রে দুদক এ ধরনের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ধরেছিল। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে দুদক থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।’
অতীতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে সুবিধা নেয়া ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি।