
রংপুরের পীরগাছায় নোবেল রেসিডেন্সিয়াল মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যালয়ের একাংশের শিক্ষক আলাদা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
এরই মধ্যে শনিবার (২২ আগস্ট) সকালে বিদ্যালয় থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) নিয়ে অন্যত্র ভর্তি হওয়ার জন্য প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক বিদ্যালয়ে জড়ো হন। একই দিন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। পরে সহকারী প্রধান শিক্ষক আল আমিন মিয়াকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে টিসি নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভিড়। কয়েকজন অভিভাবক জানান, ভালো ফলাফল ও পাঠদানের মানের কারণে তারা সন্তানদের এ বিদ্যালয়ে ভর্তি করেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাস ধরে শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, কিছু শিক্ষকের চলে যাওয়া এবং পাঠদান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তারা সন্তানদের অন্য বিদ্যালয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
অভিভাবক রঞ্জু মিয়া বলেন, আমার মেয়ে কয়েক মাস পর অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে। এমন সময়ে বিদ্যালয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী চলে গেছে। তাই মেয়েকেও আর এখানে পড়াতে চাইছি না। টিসি নিতে এসেছি।
কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, ভালো ভালো শিক্ষকরা এখান থেকে চলে গেছেন। এখানে এখন গ্রুপিং চলে। আমাদের সহপাঠিরা অনেকেই চলে গেছে। তাই আমরাও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
জানা গেছে, ২০১০ সালে আতাউর রহমান, আল আমিন মিয়া, রেজাউল করিম উজ্জ্বল ও মোহাম্মদ ইউসুফ—এই চার বন্ধু উপজেলার চন্ডিপুরে ‘নোবেল কোচিং সেন্টার’ চালু করেন। পরে সেটিকে বিদ্যালয়ে রূপ দেওয়া হয়। পীরগাছা বাজারের আব্দুল করিম শিক্ষা নিকেতনে এর অস্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হয়। ২০২০ সালে নোবেল রেসিডেন্সিয়াল মডেল উচ্চ বিদ্যালয় পাঠদানের স্বীকৃতি পায়। প্রতিষ্ঠার পর ভালো ফলাফলের কারণে অল্প সময়ের মধ্যে বিদ্যালয়টি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ৭২ জন পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করেছে। তাদের মধ্যে ৪৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। ফলাফলের দিক থেকে এ বছর পীরগাছা উপজেলায় প্রথম এবং দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে ষষ্ঠ হয়েছে বলে দাবি বিদ্যালয়টির। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৫৩৯ জন শিক্ষার্থী ও ৩২ জন শিক্ষক রয়েছেন।
তবে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের নামে জমি কেনা এবং সাবেক সভাপতি মারুফ পারভেজকে কেন্দ্র করে প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমানের সঙ্গে অপর উদ্যোক্তাদের মতবিরোধ তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক মোহাম্মদ ইউসুফকে পুনরায় পাঠদানে ফেরানোর বিষয়টি। দুই বছর আগে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক ও গোপনে বিয়ের অভিযোগ ওঠার পর তাকে পাঠদান থেকে বিরত রাখা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এই বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্যোক্তাদের মধ্যে মতবিরোধ চলছিল। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তা প্রকাশ্যে এলে বিদ্যালয়ে বিভাজন তৈরি হয়। শিক্ষার্থীদের এক পক্ষ প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমানের অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ করে, অন্য পক্ষ তার পক্ষে মিছিল করে। পরে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় এক সপ্তাহ আগে আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা বিদ্যালয়ের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন।
এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ের প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ শিক্ষার্থীকে নিয়ে একাংশের শিক্ষক পীরগাছা সরকারি কলেজ গেটসংলগ্ন সানরাইজ কিন্ডারগার্টেন ক্যাম্পাসে ক্লাস নেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের সংকট আরও প্রকাশ্যে আসে।
শনিবার টিসি নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের ভিড়ের খবর পেয়ে বিদ্যালয়ে যান সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা। পরে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান সভাপতির কাছে লিখিত অব্যাহতি পত্র দেন। সভাপতি তা গ্রহণ করে আল আমিন মিয়াকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেন।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আল আমিন মিয়া বলেন, আতাউর রহমান কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে অন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন। ওই অভিযোগ ও তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
তবে আতাউর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে এবং সভাপতির আহ্বানে আমি অব্যাহতি পত্র জমা দিয়েছি। আমি চাই, তিলে তিলে গড়ে তোলা আমার প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠানটির সংকট দ্রুত দূর হোক। তিনি দাবি করেন, তিনি আলাদা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সাথে যুক্ত নন। এই বিদ্যালয় থেকে প্রায় অর্ধেক সংখ্যক শিক্ষককে দুই সপ্তাহ আগে বের করে দেয়া হয়েছিল। তারই মূলত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বলে তিনি জানেন।
বিদ্যালয়ের সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা বলেন, প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমানের অব্যাহতির আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের চলমান সংকট নিরসনে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন বলেন, বিদ্যালয়টি একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাদের নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদ রয়েছে। তারা যেভাবে পরিচালনা করবেন, সেভাবেই চলবে। তবে কোনো অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধ দ্রুত নিরসন করে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। তাদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও আসন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতি ব্যাহত হতে পারে।