
আসন্ন শীতকালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, পরিস্থিতি উন্নতি হলেই জনমনে স্বস্তি ফিরবে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা সবকিছু ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস কোনো কিছুতেই ভালো খবর নেই। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এসব সংকট দূরীকরণে বর্তমান সরকারকে সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হয়েছে।
দেশের সাধারণ মানুষকে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি বলেন, তারা বর্তমান সরকারের প্রতি আস্থা রেখেছেন, ভোট দিয়ে বিজয়ী করে বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছেন। পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রয়োজন হলে ঋণ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে দেশের বিদ্যমান জ্বালানি সংকট, আর্থিক সংকট, ফ্যামিলি কার্ড, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, পুঞ্জীভূত অর্থনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশকে উৎপাদনমুখী, শিল্পনির্ভর ও কল্যাণভিত্তিক অর্থনীতিতে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এজন্য প্রচলিত কাঠামোর বাইরে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতার আলোকে নতুন অর্থনৈতিক মডেল প্রয়োজন। মানুষের জীবনে স্বস্তি আনা, বিনিয়োগ বাড়ানো, বন্ধ কলকারখানা চালু, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক নিরাপত্তাকে কার্যকর করার মাধ্যমে অর্থনীতিকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। জ্বালানি সংকটের ক্ষেত্রে শীতকালে স্বস্তি এবং গ্রীষ্মে দৃশ্যমান অগ্রগতির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে বড় আকারের অর্থনীতির প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
সাম্প্রতিক এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নের পেছনে ‘ফোর্স মেজর’ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতে পর্যাপ্ত মজুত না রাখায় আন্তর্জাতিক সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও বাংলাদেশের ওপর এর অভিঘাত বেশি পড়েছে। এ কারণে ভবিষ্যতে খাদ্যের মতো জ্বালানি ও বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সরকারি মজুতের মানদণ্ড তৈরি করা হচ্ছে। কাতারসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির কারণে বিকল্প পরিবহণ পথে জ্বালানি আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। দ্রুত কার্গো সংগ্রহের বিষয়ে প্রয়োজন হলে রাতেও বৈঠক করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ইতোমধ্যে ২৬টি ব্লক নিয়ে ‘অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬’ চালু করা হয়েছে এবং দরপত্র জমার শেষ সময় ৩০ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।
উপদেষ্টা জানান, অনুসন্ধান কার্যক্রমে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি বাপেক্সকে সম্পৃক্ত করা হবে। স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রের সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে। কারণ আমদানি করা এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি করে। এর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। নেট মিটারিংয়ের আওতায় প্রায় ৩৬ হাজার আবেদন পাওয়া গেছে। ২০২৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে কর ও নীতিগত সুবিধা নিয়েও সরকারের উদ্যোগ রয়েছে। পুঞ্জীভূত সংকট কাটিয়ে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে বিনিয়োগকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসাবে দেখছে সরকার।
সামাজিক নিরাপত্তায় বড় পরিবর্তন আনার কথা জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, অতীতে উপকারভোগী বাছাইয়ে ভুল ছিল। এবার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিবার চিহ্নিত করে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে ৪১ লাখ পরিবারকে এর আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষায়ও ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন তিনি। স্বাস্থ্যব্যয়ের বড় অংশ মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে যাওয়ায় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের ওপর চাপ বাড়ছে। একইভাবে দক্ষতাহীন শিক্ষিত বেকার তৈরির প্রবণতা বন্ধ করতে শিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রয়োজন হলে ঋণ নেওয়া হবে : সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম পে-স্কেলের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে। তবে কবে থেকে এবং কত ধাপে এটি কার্যকর হবে, সে সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভা নেবে বলে জানিয়েছেন তিতুমীর। পে-স্কেল প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে সংশ্লিষ্ট পে-কমিশনগুলোর প্রতিবেদন এবং সচিব কমিটির পর্যালোচনা হয়েছে। বিচার বিভাগের বেতন কাঠামো নিয়ে গঠিত কমিটির কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। এরপর মন্ত্রিসভা সব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নের সময় ও ধাপ নির্ধারণ করবে। নতুন বেতন কাঠামোর অর্থের সংস্থান প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ঋণ নেওয়া হবে। তবে ঋণ নেওয়া নিজেই সমস্যা নয়, সেই ঋণ অর্থনীতিতে কতটা গুণপ্রভাব তৈরি করছে, বিনিয়োগে কী ধরনের রিটার্ন দিচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ওপর কী প্রভাব ফেলছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।