
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব ও অবিস্মরণীয় নাম বেগম খালেদা জিয়া। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান তিনি। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের প্রশ্নে তিনি ‘আপসহীন’ নেত্রীর উপাধি পান।
আগামীকাল ১৫ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের গড়া মা, মাটি ও মানুষের রাজনৈতিক দল হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে সুদৃঢ় সাংগঠনিক কাঠামো ও জনপ্রিয়তার শেকড়ে পৌঁছে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে নানা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও সংকটের মুখে বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ় নেতৃত্বে ফিনিক্স পাখির মতো ফের ঘুরে দাঁড়িয়ে দলটিতার গ্রহণযোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা বার বার প্রমাণিত হয়েছে।
বিএনপি’র চেয়ারপার্সন এবং দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত বছর ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তাঁর জানাজায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন, যা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাজায় পরিণত হয়। শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিদায় জানায় দেশের মানুষ।
গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রাম, আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে বেগম খালেদা জিয়া ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেন। বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন ব্যক্তি নন, নিজ কর্মগুণে নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। হয়ে উঠেছেন এক জীবন্ত ইতিহাস।
বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ় নেতৃত্বের পর দলের হাল ধরেছেন তাঁর জেষ্ঠ্য পুত্র তারেক রহমান। তিনি দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর আগে তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই উৎরাই, নির্যাতন, দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন পার করেছেন তারেক রহমান। নির্বাসিত জীবন কাটিয়েও তিনি দলকে সুসংগঠিত রেখে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক দীর্ঘ লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ২০ বছর পর আবারও জনগণের বিপুল সমর্থন ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই স্লোগানকে ধারণ করে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর আগামীকাল ১৫ আগস্ট তাঁর অনুপস্থিতিতে প্রথম জন্মদিন শোক, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ায় তাকে স্মরণ করবেন বিএনপির অগণিত নেতা-কর্মীসহ দেশবাসী।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন-সংগ্রাম
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।
বেগম খালেদা জিয়ার জন্মের পর প্রথম দুইবছর কাটে জলপাইগুড়িতে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান একটি স্বাধীন দেশ হলে তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার দিনাজপুরে চলে আসেন। সেখান স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
বেগম খালেদা জিয়ার শৈশব ও শিক্ষা জীবন কাটে দিনাজপুরে। পাঁচ বছর বয়সে খালেদা খানম পুতুলকে তার বাবা দিনাজপুরের সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে ভর্তি করান। সেখানে বেগম খালেদা জিয়া প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি দিনাজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬৩ সালে এ কলেজ থেকে বেগম খালেদা জিয়া ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
বেগম খালেদা জিয়ার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ফেনী জেলার বর্তমান পরশুরাম উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসার উন্নতি লাভের আশায় ইস্কান্দার মজুমদার দিনাজপুরে এসেছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টির পর তিনি দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
গ্রেড এইটের ছাত্র ইস্কান্দার মজুমদার ১৯১৯ সালে তার বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে জলপাইগুড়িতে থাকতে গিয়েছিলেন। বর্তমানে জলপাইগুড়ি ভারতের অন্তর্ভুক্ত। সেখানে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন এবং একটি চা বাগানে চাকরি নেন। পরে তিনি চাকরি ছেড়ে চায়ের ব্যবসা শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি জলপাইগুড়ির ‘চা বাগান সমিতি’র সম্পাদক নির্বাচিত হন। সেখানে ১৯৩৭ সালের ১৯ মার্চ তার সঙ্গে তৈয়বার বিয়ে হয়। তৈয়বা বর্তমান পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ীর বাসিন্দা।
এই পরিবার ‘টি-ফ্যামিলি’ নামে পরিচিত। এই দম্পতির তিন মেয়ে ও দুই ছেলে, যাদের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া তৃতীয়। তার মা তৈয়বা মজুমদার ছিলেন সমাজকর্মী। তিনি তাঁর দিনাজপুরের বাড়িতে দুস্থ মহিলাদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনা করতেন। বেগম খালেদা জিয়ার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই।
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী :
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান হন বেগম খালেদা জিয়া। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব খালেদা জিয়া শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসেই নয়, বরং মুসলিম বিশ্বেও একজন পথিকৃৎ নারী সরকারপ্রধান হিসেবে বিরল মর্যাদা অর্জন করেন।
১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তাঁর সরকার দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠা করে। তিনি ২ এপ্রিল সংসদে সরকারের পক্ষে এই বিল উত্থাপন করেন। একই দিন তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে স্বপদে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে একাদশ সংশোধনী বিল আনেন। ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে দুটি বিল পাস হয়।
প্রথম মেয়াদে (১৯৯১-৯৫) উল্লেখযোগ্য সাফল্য:
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে পা রাখে। তাঁর প্রথম মেয়াদেই কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রসার, নারীর কর্মসংস্থানে অগ্রগতি এবং অর্থনীতির ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়। তৈরি পোশাক খাতে পাঁচ বছরে কর্মসংস্থান ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং প্রায় দুই লাখ নারী নতুনভাবে যুক্ত হন।
তিনি জাতিসংঘে গঙ্গার পানিবণ্টন ইস্যু উত্থাপন করেন, যার ফলে বাংলাদেশের ন্যায্য অংশ পাওয়া নিশ্চিত করার উদ্যোগ জোরদার হয়। ১৯৯২ সালে হোয়াইট হাউস সফরে তিনি রোহিঙ্গা সংকট তুলে ধরেন। পরবর্তী সময়ে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে।
দ্বিতীয়বার নির্বাচনে অংশগ্রহণ:
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া। স্বল্প সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস করে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তিনি। কারণ পঞ্চম জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নানা ইস্যুকে সামনে এনে টানা ১৭৩ দিন হরতাল পালন করে। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যগণ পদত্যাগ করেন। সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদে প্রয়োজনীয় সদস্য না থাকায় বেগম খালেদা জিয়া ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করেন। ষষ্ঠ সংসদে বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিল পাস হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নতুন নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থা রেখে যান বেগম খালেদা জিয়া।
ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাস হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও এককভাবে ১১৬টি আসন পেয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করে। সে নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঁচটি আসন থেকে বিজয়ী হন।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৯৯ সালে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোট নিয়ে চারদলীয় জোট গঠিত হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অগণতান্ত্রিক ও অপশাসন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে জোটভিত্তিক আন্দোলন ও কর্মসূচি পালন করে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এই জোট।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সে নির্বাচনে বিএনপি’র নেতৃত্বে চারদলীয় জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন বেগম খালেদা জিয়া। সে নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৫টি আসনে নির্বাচন করে নির্বাচিত হন তিনি।
২০০১-২০০৫ মেয়াদে উল্লেখযোগ্য সাফল্য:
নারী শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সংস্কারে তাঁর সরকার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। ২০০৫ সালে নারীর ক্ষমতায়নে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ফোর্বস ম্যাগাজিনে বিশ্বের ক্ষমতাশালী নারীদের তালিকায় তিনি ২৯তম স্থান পান। তাঁর সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, উপবৃত্তি ও খাদ্য সহায়তা, সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা বৃদ্ধিসহ নানা যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। পরীক্ষায় নকল দমনেও তাঁর সরকারের সফলতা প্রশংসিত হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও আলোচিত এক-এগারো:
সংবিধান অনুযায়ী ২০০৬ সালের নভেম্বরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন বেগম খালেদা জিয়া। ওই সরকার ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করে তফসিল ঘোষণা করেছিল। সকল রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র দাখিল করে। একপর্যায়ে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের তফসিল স্থগিত করা হয়।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায় আসে ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাদের নানা কর্মকাণ্ড বিশেষ করে রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার তৎপরতা তখন দৃশ্যমান হয়েছিল। এক-এগারোর সরকার বড় আঘাত হানে বিএনপির ওপর। বিএনপিকে ভাঙতে চেষ্টা চালায়।
বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়াকে দিয়ে দলে ভাঙন ধরানোর প্রচেষ্টা চালানো হয়। এ পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আব্দুল মান্নান ভূঁইয়াকে দল থেকে বহিষ্কার করে দলের প্রবীণ নেতা খন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসা থেকে বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ বেগম খালেদা জিয়ার জেষ্ঠ্যপুত্র ও বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান গ্রেফতার হন।
বেগম খালেদা জিয়াকে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুক্তি দেওয়া হয়। তারেক রহমানকে মুক্তি দেওয়া হয় ৩ সেপ্টেম্বর। গ্রেফতারের পর যৌথবাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হন তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। কারামুক্তির পর তারেক রহমানকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন ও আরাফাত রহমান কোকোকে থাইল্যান্ড পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে আরাফাত রহমান কোকো মালয়েশিয়ায় থাকতেন। সেখানে অসুস্থ হয়ে ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার একটি বাড়িকে সাবজেল ঘোষণা করে সেখানে তাঁকে আটক রাখা হয়। এ সময়ে তার দুই সন্তানও কারাবরণ করেন। জিয়া পরিবারের ওপর এক এগারোর জরুরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্যাতন নিপীড়ন ছিল বর্ণনাতীত।
পাশাপাশি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব ও সাবেক মন্ত্রী ও আমলাদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। বিএনপিকে বিভক্ত করতে নানামুখী তৎপরতা চালায় সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তখনও কারাবন্দী খালেদা জিয়াই ছিলেন দলীয় ঐক্যের প্রতীক।
২০০৭ সালের এক-এগারো ছিল একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। দেশকে রাজনীতিশূন্য এবং জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নির্মূল করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইনের নেতৃত্বে নতুন ধরনের সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। দেশে জারি হয় জরুরি অবস্থা।
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। নানা সংকট ও ষড়যন্ত্রের মাঝেই ওই নির্বাচনে অংশ নেয় বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি। এ নির্বাচনে বিএনপি বিরোধী দল হয়। বেগম খালেদা জিয়া ৩টি আসনে নির্বাচন করে সবকটিতে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। নির্বাচনটি ছিল একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন, যেখানে ফলাফল পূর্ব নির্ধারিত ছিল নেপথ্য কুশীলবদের। তবুও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের স্বার্থে নির্বাচনে অংশ নেন বেগম খালেদা জিয়া। এ সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার:
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের দুই মাস না যেতেই রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে বিডিআর বিদ্রোহের নামে ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর এক কাপড়ে বেগম খালেদা জিয়াকে শহীদ জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ৪০ বছরের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। যে বাড়িতে জন্ম তাঁর দুই সন্তান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর। এখানে তাদের শৈশব, কৈশোর ও বিবাহসহ বাচ্চাদেরও জন্ম হয়েছে।
সেদিন সন্ধ্যায় বেগম খালেদা জিয়া গুলশানে তাঁর রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সামনে কান্না বিজড়িত কন্ঠে বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে আমাকে প্রেসিডেন্ট জিয়ার স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি থেকে উৎখাত করা হয়েছে।’ তাঁর দীর্ঘদিনের সংসারের সব মালামাল ফেলে রেখে তাঁকে এক কাপড়ে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়। সেদিন বেগম খালেদা জিয়ার কান্নায় কেঁদেছিল সারাদেশের অগণিত মানুষ।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও খালেদা জিয়ার মুক্তি :
চাকরিতে কোটা ইস্যুকে কেন্দ্র করে উচ্চ আদালতের এক রায়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানায় দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলন কোটা সংস্কার আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ।
আন্দোলন দমন করতে গিয়ে ওইদিন আরও কয়েকজন হত্যার শিকার হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পর সারাদেশের ছাত্র সমাজসহ বিএনপি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, সাধারণ মানুষ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনে শুরু থেকেই বিএনপি সমর্থন জানায়। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে অংশ নেয়। এ আন্দোলন দমন ও নির্মূল করতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার গণহত্যাসহ নানা নির্যাতন নিপীড়ন চালায়।
আন্দোলন রূপ নেয় প্রবল গণঅভ্যুত্থানে। একপর্যায়ে চব্বিশের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। তার সাথে ছিলেন তার বোন শেখ রেহানাও। এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়।
শেখ হাসিনার সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিতর্কিত অনেক কর্মকর্তা ৫ আগস্ট-এর আগে ও পরে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে দেশেও অনেকে গ্রেফতার হন।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ এ শাসনকালে কখনো মাথানত করেননি বেগম খালেদা জিয়া। তিনি গণতন্ত্র, সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ছিলেন অবিচল ও আপসহীন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বেগম খালেদা জিয়া শর্তসাপেক্ষ অবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পান।