জনডাক ডেস্ক
২৭ জুলাই ২০২৬, ৫:৩১ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

তিস্তার ভাঙনে ৮ বার ঘর সরিয়েছি এখন আর সরানোর জায়গাও নেই

বিয়ের পর যখন এই বাড়িতে এসেছিলাম, তখন আমাদের ঘর ছিল তিস্তা নদীর মাঝামাঝি। একে একে সব শেষ হয়ে গেছে। আটবার ঘর ভেঙেছে। এখন আর জানি না কতবার ঘর হারালে সরকার আমাদের জন্য একটা স্থায়ী বাঁধ দেবে।

কথাগুলো বলতে বলতে চোখের কোণে জমে ওঠে অশ্রু। কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে ষাটোর্ধ্ব অফেজা বেগমের। পেছনে তিস্তার গর্জন, সামনে ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন। যে উঠানে বসে তিনি স্মৃতিচারণ করছিলেন, সেই উঠানের অর্ধেক অংশও ইতোমধ্যে তিস্তা নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

অফেজা বেগম নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের পশ্চিম ছাতুনামা গ্রামের কেল্লাপাড়া এলাকার বাসিন্দা। স্বামী তোয়াল উদ্দিনের সঙ্গে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিস্তার ভাঙনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে চলছেন। কিন্তু সেই যুদ্ধে জয় মেলেনি কখনো। নদী বারবার কেড়ে নিয়েছে তাদের ঘর, আঙিনা, ফসলি জমি, গাছপালা, স্মৃতি আর স্বপ্ন।

অফেজা বেগমের মতো এমন অসংখ্য পরিবার রয়েছে কেল্লাপাড়া ও আশপাশের এলাকায়। তাদের জীবন যেন নদীর স্রোতের সঙ্গে বাঁধা। বছরের পর বছর ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটে। বর্ষা এলেই তারা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখেন। রাতে ঘুম ভেঙে নদীর শব্দ শুনতে হয়। কখনো মাঝরাতে ঘর খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে, আবার কখনো চোখের সামনে ঘর নদীতে তলিয়ে যায়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকদিন আগে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছিল। পরে তিস্তার পানি নেমে যাওয়ায় ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমে শুরু হয়েছে নদীর ভাঙন। ইতোমধ্যে সেখানে প্রায় পাঁচটি পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কেউ কেউ দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়েছে আবার কেউ ভাঙন আতঙ্কে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। আবার অনেকের বাড়ির সামনে ভাঙন ধরেছে কারো আবার উঠানে। তিস্তায় ঘরবাড়ি বিলীন হওয়া থেকে রক্ষা করতে অনেকে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন। গত কয়েকদিন ধরে অনেকের বাড়িতে চুলা জ্বলেনি শুকনা খাবার খেয়েই দিন পার করছেন তারা। সেখানের বাসিন্দারা নিরাপদ খাবার পানি, চিকিৎসা ও খাদ্য সংকটে ভুগছেন।

আরও দেখা যায়, কেল্লাপাড়া এলাকা থেকে সরে অনেকে দূরে কোথায় ঘরবাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। আবার কারো জায়গা না থাকায় আগের জায়গা থেকে একটু দূরে নতুন করে ঘর নির্মাণ করছেন।

অফেজা বেগম বলেন, বিয়ের পর যে বাড়িতে এসেছি, সেটি ছিল নদী থেকে অনেক দূরে। সেখানে ছিল টিনের ঘর, ফলের বাগান, চাষের জমি আর সচ্ছলতার স্বপ্ন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিস্তার গতিপথ বদলাতে থাকে। শুরু হয় নদীভাঙন। প্রথমে কিছু জমি, পরে বসতভিটা, এরপর একের পর এক নতুন করে গড়ে তোলা ঘরও নদীতে হারিয়ে যায়। প্রতিবার ভেবেছি এবার হয়তো আর ভাঙবে না। কিন্তু বর্ষা এলেই বুক ধড়ফড় করে। কখন নদী এসে ঘর নিয়ে যাবে সেই ভয় নিয়েই বেঁচে আছি। আটবার ঘর সরিয়েছি, এখন আর সরানোর জায়গাও নেই।

সেখানের আরেক বাসিন্দা আমেনা বেগম বলেন, তিস্তা নদী আমাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে, আমরা যারা তিস্তার পাড়ে থাকি আমাদের কষ্টের শেষ নাই। বর্ষাকাল আসলেই আমাদের রাতের ঘুম হয়না। এখানে আমরা যারা আছি কোনো ধরনের ত্রাণ চাইনা, আমরা চাই সরকার আমাদের স্থায়ী বাঁধ দিক। এখানে আমরা যারা আছি আমাদের ঘরবাড়ি অনেকবার করে ভেঙেছে আবার বর্ষা এসেছে কখন ভাঙবে ঠিক নাই।

স্থানীয় বাসিন্দা আবু তালেব বলেন, তিস্তা পাড়ের মানুষের কষ্ট বলে বুঝানো সম্ভব না। আমরা এখানে যারা বসবাস করি তারা অসংখ্যবার ঘরবাড়ি ভাঙনের সাক্ষী হয়েছি। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবতায় করা।

স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন,

আমরা তো বেশি কিছু চাই না। শুধু এমন একটা বাঁধ চাই, যাতে অন্তত বাকি জীবনটা নিশ্চিন্তে কাটাতে পারি। বারবার ঘর বানানোর শক্তি আর নেই। বর্ষা মৌসুম এলেই তিস্তার পানি বৃদ্ধি পায়। সেই সঙ্গে বাড়ে নদীর তীর ভাঙনের ঝুঁকি। দিনের পর দিন আতঙ্কে কাটাতে হয়।

এবিষয়ে ডিমলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরি বলেন, বিভিন্ন জায়গায় ভাঙন দেখা দিলে জরুরিভিত্তিতে কাজ করা হয়। কেল্লাপাড়া এলাকায় ভাঙন রক্ষায় প্রায় ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে।

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান বলেন, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে পানিবন্দি মানুষের জন্য শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ করা হয়।

 

Facebook Comments Box

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পীরগঞ্জে প্রেমের টানে চীন থেকে যুবক, ফেসবুকের প্রেম গড়াল বিয়েতে

পীরগঞ্জে প্রেমের টানে চীন থেকে যুবক, ফেসবুকের প্রেম গড়াল বিয়েতে

পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে গ্যাস সমস্যা স্বাভাবিক হবে: প্রধানমন্ত্রী

পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে গ্যাস সমস্যা স্বাভাবিক হবে: প্রধানমন্ত্রী

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের পক্ষে ‘শতশত ভুয়া খবর’ ছড়িয়েছেন গাইবান্ধার এক ব্যক্তি

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের পক্ষে ‘শতশত ভুয়া খবর’ ছড়িয়েছেন গাইবান্ধার এক ব্যক্তি

ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে রেসিং করতে গিয়ে প্রাণ হারাল বাইকার, ফেলে পালালো বন্ধুরা

ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে রেসিং করতে গিয়ে প্রাণ হারাল বাইকার, ফেলে পালালো বন্ধুরা

‘মান-অভিমানের’ কারণে এনসিপিতে যোগ দিলেন বিএনপি নেতা

‘মান-অভিমানের’ কারণে এনসিপিতে যোগ দিলেন বিএনপি নেতা

১০

পীরগাছায় গাঁজাসহ যুবক আটক,ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৬ মাসের কারাদণ্ড

১১

সন্ত্রাসী কায়দায় দুই নেতাকে মারধরের প্রতিবাদে ববি ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল 

১২

নড়াইলের লোহাগড়া আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কুপিয়ে হত্যা

১৩

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের গাড়িতে ট্রাকের ধাক্কা

১৪

ছাত্রদল কর্মী মেহেরুনকে নিয়ে ‘উধাও’ শিক্ষক অসীম কুমার

১৫

এবার কারিগরি ত্রুটিতে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ, দেশে লোডশেডিং বাড়ছে

১৬

এবার কারিগরি ত্রুটিতে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ, দেশে লোডশেডিং বাড়ছে

১৭

চীন ও পাকিস্তানিসহ ৬২ বিদেশি নাগরিক আটক

১৮

​সুস্থ হয়েও জটিল রোগের সরকারি চিকিৎসা সহায়তার ১৫ হাজার টাকার নামের তালিকায় অধ্যক্ষ আব্দুর রশিদ

১৯

হুট করে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র অচল, আরও বাড়ল লোডশেডিং

২০