জনডাক ডেস্ক
৩ নভেম্বর ২০২৬, ৯:০১ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

গ্রাহকের কোটি টাকা আত্মসাৎ: অভিযুক্ত মূল হোতা বরখাস্তকৃত ব্যাংক কর্মকর্তা মুরাদ এখন কুড়িগ্রামে, পলাতক সহযোগী…

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ সোনালী ব্যাংক শাখার অর্ধশতাধিক সহজ-সরল গ্রাহকের প্রায় ১ কোটি টাকা কৌশলে আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকের সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক ও বর্তমানে কুড়িগ্রাম সোনালী ব্যাংকের ডিজিএম কার্যালয়ের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার (এসপিও) শরীফ হাসান মুরাদের বিরুদ্ধে। এ জালিয়াতি ও আত্মসাতের ঘটনায় তার প্রধান সহযোগী হিসেবে নাম এসেছে ব্যাংকটির পলাতক নৈশ্যপ্রহরী ফিরোজ মিয়ার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নানা অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়ে সম্প্রতি সাময়িক বরখাস্ত হয়ে কুড়িগ্রাম সোনালী ব্যাংকের ডিজিএম কার্যালয়ে বদলি হন শরীফ হাসান মুরাদ। তিনি বদলি হওয়ার পরপরই তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী নৈশ্যপ্রহরী ফিরোজ মিয়া বিপাকে পড়েন এবং গত ২০ জুলাই থেকে আত্মগোপনে চলে যান। এ ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক পংকজ কান্তি রায় বাদী হয়ে কিশোরগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-১৪৯১) দায়ের করেছেন।

দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ততাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয় ব্যাংক পাড়া ও ভুক্তভোগী গ্রাহকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

যেভাবে চলতো কোটি টাকার প্রতারণা

স্থানীয়দের তথ্যমতে, কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ইসমাইল গ্রামের কছির উদ্দিনের ছেলে ফিরোজ মিয়া গত ১৫-২০ বছর ধরে ওই ব্যাংকে নৈশ্যপ্রহরী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পদে নৈশ্যপ্রহরী হলেও তৎকালীন অসাধু শাখা ব্যবস্থাপক শরীফ হাসান মুরাদের সরাসরি প্রশ্রয়ে ও ছত্রছায়ায় তিনি ব্যাংকের নিয়মিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা, ঋণের ফাইল প্রস্তুত করা এমনকি টাকা জমা ও উত্তোলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজও করতেন ফিরোজ। দীর্ঘদিন এসব কাজ করায় সহজ-সরল গ্রাহকদের কাছে তিনি ব্যাংকের অন্যতম ‘আস্থার প্রতীক’ হয়ে ওঠেন।

ভুক্তভোগী ছাদিকুল মিয়া জানান, “ঋণের বিষয়ে ব্যাংকের ভেতরে মুরাদের নির্দেশে আগে ফিরোজের সঙ্গেই কথা বলতে হতো। ফিরোজ যাদের সুপারিশ করত, মুরাদ তাদের ঋণ দ্রুত পাস করে দিতেন। ঋণ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও কৃষকদের ফাঁকা চেক, এনআইডি, অলিখিত স্ট্যাম্প ও ছবি জমা রাখা হতো। পরে বড় অঙ্কের ঋণ পাস করিয়ে গ্রাহকদের হাতে সামান্য টাকা দেওয়া হতো। কয়েক বছর পর ঋণের নোটিশ পেয়ে গ্রাহকরা জানতে পারতেন আসল ঋণের পরিমাণ, যা দেখে অনেকে বাধ্য হয়ে ভিটেমাটি বিক্রি করে ব্যাংকের দায় শোধ করেছেন।”

অন্য এক ভুক্তভোগী তহুরা বেগম জানান, ডিপিএসের টাকা তুলতে গেলে ফিরোজ চেকে স্বাক্ষর নিয়ে কয়েকদিন পর আসতে বলেন। পরে ব্যাংকে গিয়ে দেখেন অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। ব্যাংকের তৎকালীন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানালে তারা ঘটনাটি চেপে যাওয়ার তাগিদ দেন। এছাড়া আরজিনা বেগম নামে এক শিক্ষিকার ২৮ হাজার টাকা এবং রবিউল ইসলাম নামে এক শিক্ষকের ৭০ হাজার টাকা জমা না দিয়ে ভুয়া রশিদ দেওয়া হয়। এ সময় তাদের মোবাইল নম্বরে আসা ব্যাংকের এসএমএস সার্ভিসও কৌশলে বন্ধ রাখা হয়েছিল।

ভুক্তভোগী গ্রাহক মশিউর রহমান ও রাসেল সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, “তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক শরীফ হাসান মুরাদের প্রত্যক্ষ মদদ ও সম্পৃক্ততা ছাড়া একজন নৈশ্যপ্রহরীর পক্ষে কোটি টাকার এত বড় দুর্নীতি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মুরাদ ও ফিরোজ যৌথভাবে গ্রাহকের কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। নিরপেক্ষ তদন্ত হলেই বরখাস্তকৃত ব্যাংক কর্মকর্তা মুরাদের মূল জালিয়াতি বেরিয়ে আসবে।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পলাতক ফিরোজের বাবা কছির উদ্দিন ছেলের প্রতারণার সত্যতা স্বীকার করে জানান, গাড়া গ্রামের তহুরা বেগমসহ কয়েকজনের ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা বর্তমান ব্যাংক ম্যানেজার পংকজ কান্তি রায়ের মাধ্যমে ইতিমধ্যে ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে এত টাকা নিয়ে ছেলে কোথায় আছে তা তিনি জানেন না।

অন্যদিকে, তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে অভিযুক্ত ফিরোজের দুলাভাই শফিকুল ইসলাম নিজেদের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কর্মী পরিচয় দিয়ে সাংবাদিকদের সাথে অত্যন্ত অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।

সাংবাদিকদের সাথে বরখাস্তকৃত কর্মকর্তা মুরাদের অসৌজন্যমূলক আচরণ ঘটনার সত্যতা জানতে কুড়িগ্রাম সোনালী ব্যাংকে গিয়ে অভিযুক্ত সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার (এসপিও) শরীফ হাসান মুরাদের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের উপর চরম ক্ষিপ্ত হন এবং মেজাজ দেখিয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় তিনি বিষয়টি নিয়ে ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম)-এর সাথে কথা বলার তাগিদ দেন।

পরবর্তীতে কুড়িগ্রাম সোনালী ব্যাংকের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) আতাহারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “আমি কুড়িগ্রামে নতুন এসেছি, তাই এ বিষয়টি আমার জানা নেই। শরীফ হাসান মুরাদ এখানে ৬ মাসের কম সময় ধরে কর্মরত আছেন। তবে এটি তার ব্যক্তিগত বিষয় এবং এ সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও তদন্ত কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।

এ বিষয়ে জানতে কিশোরগঞ্জ সোনালী ব্যাংকের বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক পংকজ কান্তি রায় জানান, গত ২০ জুলাই থেকে ফিরোজ কর্মস্থলে অনুপস্থিত। বর্তমানে পুরো ঘটনার বিভাগীয় তদন্ত চলছে।

কিশোরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল গফুর মিয়া জানান, নৈশ্যপ্রহরীর নিখোঁজ থাকার বিষয়ে ব্যাংকের বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক একটি জিডি করেছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে।

Facebook Comments Box

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নির্বাচনে ভরাডুবির জন্য ইরানকে দায়ী করলেন ট্রাম্প

১

‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে হাদিসের সঙ্গে তুলনা পদ হারালেন সরকারি কর্মকর্তা

২

সাভার-আশুলিয়ায় কারখানা ভাঙচুরের ঘটনায় তিন মামলায় আসামি ২৩০০, গ্রেপ্তার ১১

৩

হোটেলে কাজ করে জিপিএ-৫ পেলেন কুড়িগ্রামের বিশাল

৪

পরিবর্তনের প্রত্যয় নিয়ে পীরগঞ্জের কুমেদপুরে চেয়ারম্যান প্রার্থী তরুণ নেতা জাবেদ আহমেদ সাগর

৫

গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভ ঠেকাতে ২৫ প্লাটুন বিজিবি-এসআরবি-আনসার মোতায়েন

৬

শুধু ‘সরি’ বললেই কি মুছে যায় সব কষ্ট?

৭

পল্লবীতে কুরিয়ার সার্ভিসের সামনে পরপর দুই ককটেল বিস্ফোরণ

৮

গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনে মারা গেছেন গাইবান্ধার তৌফিক

৯

পুলিশ পরিচয়ে মহিষ ডাকাতি, ছাত্রদল সভাপতিসহ গ্রেপ্তার ৫

১০

গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করছে বিরোধী দল

১১

৬ সন্তানের কেউই নিচ্ছেন না দায়িত্ব, ৯৫ বছরের শামসুলের ঠাঁই এখন গাছতলায়

১২

সার্জেন্টের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর জুয়েলের বিরুদ্ধে জিডি

১৩

লরির ধাক্কায় মিনিবাস উল্টে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী নিহত, মহাসড়ক অবরোধ

১৪

কাউনিয়ার সমিতি দখল ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে বঞ্চিত সমবায়ীদের মানববন্ধন

১৫

মিঠাপুকুরে অটোরিকশার ভেতরে ঘুমন্ত চালকের মৃত্যু, এলাকায় চাঞ্চল্য

১৬

হাসিনার সম্পত্তি বিক্রির অর্ধেক অর্থ পাবেন অভ্যুত্থানে নিহতদের স্বজনেরা, মন্ত্রণালয়ে চিঠি

১৭

‘রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রশ্ন করার এখতিয়ার ডিবিকে কে দিয়েছে’

১৮

মিরপুরে শ্রমিক-পুলিশ সং’ঘ’র্ষ, বন্ধ মেট্রোরেল স্টেশন

১৯

বাসাবাড়ির সৌরবিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সায় কিনবে সরকার

২০