৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩১ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

জরুরি পরিস্থিতির জন্য খাবার-পানি মজুত করতে বলছে বিভিন্ন দেশ, কীসের আশঙ্কা?

হঠাৎ করেই বিশ্বের একাধিক উন্নত দেশে ঘরে ঘরে অন্তত তিন দিন থেকে এক সপ্তাহের খাবার ও পানি মজুত রাখার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ নাগরিকদের জন্য জারি করা এসব সরকারি নির্দেশনার পর বাজারগুলোতে টিনজাত খাবার, বোতলজাত পানি, টর্চলাইট ও ব্যাটারিচালিত রেডিও কেনার ধুম পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জনমনে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—বিশ্বজুড়ে কি বড় ধরনের কোনো যুদ্ধ বা আসন্ন মহাবিপর্যয়ের শঙ্কা তৈরি হয়েছে?

সম্প্রতি যুক্তরাজ্য সরকার ‘বি রেডি’ নামের একটি জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান শুরু করে। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো, যেকোনো বড় ধরনের সংকট বা ব্ল্যাকআউটের প্রথম ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন নাগরিকেরা যেন নিজেরাই নিজেদের মৌলিক চাহিদা মিটিয়ে টিকে থাকতে পারেন। ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশনায় পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য দৈনিক তিন লিটার খাবার পানি, অপচনশীল শুকনো বা টিনজাত খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পাওয়ার ব্যাংক এবং হাতল ঘুরিয়ে চালানো যায় এমন রেডিও মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

লন্ডন প্রশাসনের ভাষ্যমতে, ঝড়, আকস্মিক বন্যা কিংবা সাইবার হামলায় জাতীয় গ্রিড বিপর্যস্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি সেবা পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। নাগরিকেরা প্রথম কয়েক দিন নিজেদের রসদে চলতে পারলে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা প্রান্তিক মানুষদের দ্রুত সহায়তা দেওয়ার সুযোগ পাবে।

সরকারের এই আহ্বানের পরপরই যুক্তরাজ্যের খুচরা বাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। সুপারমার্কেট চেইন আইসল্যান্ডে টিনজাত পণ্যের বিক্রি রাতারাতি প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রেডিও বিক্রি ১৬০ শতাংশ এবং টর্চলাইটের বিক্রি প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বাড়তে দেখা গেছে। তবে দেশটির খুচরা বিক্রেতারা নিশ্চিত করেছেন, পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং দেশে কোনো খাদ্যসংকট তৈরি হয়নি।

একই ধরনের নাগরিক প্রস্তুতি জোরদার হয়েছে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও। নিউজউইকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডা, জাপান, মেক্সিকো ও নেদারল্যান্ডসেও পরিবারগুলোকে অন্তত তিন দিনের জরুরি প্রস্তুতি রাখার নির্দেশ রয়েছে।

আবার সুইডেন ও নরওয়ে নাগরিকদের অন্তত এক সপ্তাহ এবং জার্মানি প্রায় ১০ দিনের প্রয়োজনীয় রসদ মজুত রাখার পরামর্শ দিচ্ছে। তবে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতিটি দেশের ঝুঁকির ধরন ভিন্ন। যেমন জাপানে মূল ফোকাস থাকে শক্তিশালী ভূমিকম্প ও সুনামির ওপর, আবার অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকোতে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলাই মুখ্য।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে অবশ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি বদলে যাওয়া ভূরাজনীতি ও সংঘাতের শঙ্কা বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশন তাদের ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’র আওতায় সদস্যদেশগুলোকে যে বার্তা দিয়েছে, তাতে জলবায়ু ঝুঁকির সমান্তরালে সাইবার যুদ্ধ ও বহিরাগত আগ্রাসনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ সুইডেন তাদের বিখ্যাত ‘ইফ ক্রাইসিস অর ওয়ার কামস’ নির্দেশিকায় সংকটকালীন পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধকালীন টিকে থাকার কৌশল যুক্ত করেছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, উত্তর ইউরোপের দেশগুলোতে এমন নির্দেশিকা বহু দশকের পুরোনো ঐতিহ্য; এটি আকস্মিক কোনো যুদ্ধ ঘোষণার পূর্বাভাস নয়।

অন্যদিকে সামরিক ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি আত্মরক্ষার নতুন রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর তাদের ‘ফোর্ট্রেস আমেরিকা’ উদ্যোগের আওতায় গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলোকে বাইরের রসদ ছাড়া অন্তত ৯০ দিন সচল রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এর মধ্যে রয়েছে সামরিক ঘাঁটির নিজস্ব জ্বালানি ও বিদ্যুৎব্যবস্থা নিশ্চিত করা, সাইবার নিরাপত্তা বাড়ানো এবং জরুরি মজুত দ্বিগুণ করা। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের বরাতে স্পষ্ট করা হয়েছে, ৯০ দিনের এই দীর্ঘ প্রস্তুতি শুধুই সামরিক স্থাপনার নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখার অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা, সাধারণ জনগণের জন্য এমন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি, নিউজউইক, স্কাই নিউজ এবং দ্য গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব নির্দেশনার পেছনে কোনো একক কারণ বা তাৎক্ষণিক যুদ্ধ আসন্ন হওয়ার প্রমাণ নেই। বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাষ্ট্রীয় বা অরাষ্ট্রীয় শক্তির সাইবার হামলা এবং আকস্মিক বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো বহুমুখী ঝুঁকি মোকাবিলা করতেই এই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সরকারি গাইডলাইনগুলোকে যুদ্ধের সাইরেন হিসেবে দেখে আতঙ্কিত হওয়ার সুযোগ নেই। বরং মহামারি, যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং চরম আবহাওয়ার এই যুগে নাগরিক সমাজকে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অচলবস্থার মুখে স্বাবলম্বী রাখাই আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর এই সমন্বিত প্রস্তুতির মূল লক্ষ্য

Source: https://www.drb.news/%e0%a6%9c%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a6%bf-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%96%e0%a6%be/

Facebook Comments Box

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাসাবাড়ির সৌরবিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সায় কিনবে সরকার

১

জেল হত্যা দিবস আজ

২

জরুরি পরিস্থিতির জন্য খাবার-পানি মজুত করতে বলছে বিভিন্ন দেশ, কীসের আশঙ্কা?

৩

সাভারের আশুলিয়ায় শ্রমিক বিক্ষোভ, পুলিশের টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ

৪

গ্রাহকের কোটি টাকা আত্মসাৎ: অভিযুক্ত মূল হোতা বরখাস্তকৃত ব্যাংক কর্মকর্তা মুরাদ এখন কুড়িগ্রামে, পলাতক সহযোগী…

৫

একই রাস্তা সকালে উদ্বোধন করলেন জামায়াতের এমপি, বিকেলে বিএনপির সাবেক এমপি

৬

কাউনিয়ায় সাজাপ্রাপ্ত আসামিসহ গ্রেপ্তার ৩, ইয়াবা উদ্ধার

৭

নিজ স্ত্রীর সঙ্গে’ ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ভাইরাল, জামায়াত নেতার রুকন পদ স্থগিত

৮

শিক্ষার্থী ১৯৯, উপস্থিত ১১ জন, হঠাৎ হাজির ইউএনও— শোকজ দুই শিক্ষককে, কপাল পুড়ল প্রতিষ্ঠান প্রধানেরও

৯

স্বামীর ৬ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় নার্স স্ত্রী কারাগারে

১০

২২৩ টাকা বাড়িয়ে ১২ কেজি এলপিজির দাম ২০৬০ টাকা নির্ধারণ

১১

নাস্তার লোভ দেখিয়ে বাকপ্রতিবন্ধী কিশোরকে বলাৎকার, অভিযুক্তকে গণধোলাই

১২

মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুনের ঘটনায় জামায়াত আমিরকে গ্রেপ্তারের দাবি রাশেদ খাঁনের

১৩

নীলফামারীতে ৫৯ শিক্ষকের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী মাত্র ৪, এইচএসসিতে পাস করেননি কেউ

১৪

মোটরসাইকেলের সামনের নম্বরপ্লেটে পরিবর্তন, এক লাইনে লেখার অনুমতি

১৫

গাজীপুরে পুলিশের ৩ গাড়িতে আগুন, সাংবাদিকসহ বিজিবি সদস্য আহত

১৬

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জামায়াত-এনসিপির দূরত্ব, আসন সমঝোতার অভিমানে লংমার্চে যাননি নাহিদ ইসলাম

১৭

নির্ধারিত সময়ে পাওয়া যায়না অফিসে, হাজিরা দিয়ে উধাও রংপুর প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা

১৮

গাজীপুরে আজও পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ-অবরোধ, অর্ধশতাধিক যানবাহন ভাঙচুর

১৯

লুকিয়ে হলে অবস্থান, ঢাবির হল থেকে ছাত্রলীগ নেতা আটক

২০