উচ্চতা মাত্র ২ ফুট ৯ ইঞ্চি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর চরম দারিদ্র্য যেন তার জীবনের নিত্যসঙ্গী। তবুও কোনো বাধাই থামাতে পারেনি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বামন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মল্লিকা খাতুনকে। অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও শিক্ষার প্রতি গভীর ভালোবাসা নিয়ে তিনি এবার ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজের বিএমটি শাখার প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। সাইফুল রহমান সরকারি কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়া মল্লিকার সংগ্রামী জীবন এখন অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার গল্প।
মল্লিকার বাড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়নের পশ্চিম পানিমাছকুটি গ্রামে। তিনি দিনমজুর মনির হোসেন ও আকলিমা বেগম দম্পতির মেয়ে। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে মল্লিকা ও তার ছোট বোন মেঘলা খাতুন দুজনই বামন প্রতিবন্ধী। মেঘলার উচ্চতা ২ ফুট ৫ ইঞ্চি এবং তিনি মিয়াপাড়া দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
পরিবারের বড় দুই ছেলে আলাদা সংসার করেন। বড় মেয়ের বিয়েও অনেক কষ্টে দিয়েছেন বাবা-মা। প্রায় পাঁচ বছর ধরে অসুস্থ থাকায় মনির হোসেন আর কাজ করতে পারেন না। ফলে সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে স্ত্রী আকলিমা বেগমের ওপর। বাড়ির সামনে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান চালিয়ে প্রতিদিন সামান্য আয় এবং দুই মেয়ের প্রতিবন্ধী ভাতাই এখন পরিবারের প্রধান অবলম্বন।
অভাবের মধ্যেও দুই মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ করেননি আকলিমা বেগম। নিজের কষ্টের কথা ভুলে তিনি মেয়েদের স্বপ্ন পূরণে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অর্থ সংকট থাকলেও উচ্চশিক্ষা অর্জনের লক্ষ্য থেকে একচুলও সরে যাননি মল্লিকা।
পরীক্ষা কেন্দ্রে মল্লিকাকে দেখে অনেকেই তার সাহস ও অধ্যবসায়ের প্রশংসা করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনো মানুষের স্বপ্নকে থামিয়ে রাখতে পারে না—মল্লিকা তারই জীবন্ত উদাহরণ।
প্রতিবেশী আব্দুল মালেক লেচু, মালেক মিয়া ও মমিনুল ইসলাম মমিন বলেন, অসুস্থতার কারণে মনির হোসেন কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। এমন অবস্থায়ও আকলিমা বেগম দুই প্রতিবন্ধী মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা সরকার, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলোর প্রতি পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
মল্লিকা খাতুন বলেন, “অভাব-অনটনের মধ্যেও আমরা দুই বোন পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। আমি উচ্চশিক্ষা অর্জন করে সরকারি কলেজের একজন শিক্ষক হতে চাই। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বাবা-মায়ের কষ্ট দূর করতে চাই। আমার স্বপ্ন পূরণে সবার দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করছি।”
ছোট বোন মেঘলা খাতুনও লেখাপড়া চালিয়ে যেতে সবার দোয়া ও সহযোগিতা চান।
মল্লিকার মা আকলিমা বেগম বলেন, “আমার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। ছোট্ট একটি চায়ের দোকান চালিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। শত কষ্টের মধ্যেও মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ করিনি। মল্লিকা এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৪৬ পেয়েছে। আমার স্বপ্ন, সে লেখাপড়া শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে।”
ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম রিজু বলেন, “শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও মল্লিকার ইচ্ছাশক্তি ও পড়াশোনার আগ্রহ অসাধারণ। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে সে ভবিষ্যতে আরও ভালো করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।”
সাইফুল রহমান সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব মো. জাকির হোসেন বলেন, “শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নয়, মানুষের ইচ্ছাশক্তিই তাকে সফলতার পথে এগিয়ে নেয়। মল্লিকার এই অদম্য প্রত্যয় অন্য শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রাণিত করবে।”