
বাংলায় শরৎকাল বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কাশবাগানের এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর নদীর ধারে বালুচরে বাতাসে দুলতে থাকা ধবধবে সাদা কাশফুল বাঙালির চিরন্তন শরতের রূপকে ফুটিয়ে তোলে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, বিস্তীর্ণ বালুচরে প্রকৃতি যেন সাদা চাদর বিছিয়ে রেখেছে। এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।
এমন অমায়িক সৌন্দর্যের দেখা মিলছে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার সীমান্তবর্তী তিস্তা নদীর চরে। বিকেল গড়াতেই কাশফুলের শুভ্র টানে সেখানে জড়ো হন নানা বয়সী মানুষ। কেউ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, কেউ মুঠোফোনের ক্যামেরায় ধরে রাখছেন মুহূর্তগুলো। শিশুদের ছোটাছুটি আর তরুণ-তরুণীদের ছবি তোলায় মুখর হয়ে উঠছে নির্জন চর।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলার টেপাখরিবাড়ি ইউনিয়নের বার্নির ঘাট বিজিবি ক্যাম্প-সংলগ্ন তিস্তার চরে সরেজমিনে দেখা যায়, প্রকৃতিপ্রেমীদের ভিড়। ছোট্ট একটি জলাধার পার হয়ে সবাই ছুটছেন তিস্তার চরের দিকে। প্রায় এক কিলোমিটারজুড়ে ফুটেছে কাশফুল। সবুজ লম্বা পাতার বুক চিরে বেরিয়ে আসা শুভ্র কাশফুল কোথাও থোকা থোকা, কোথাও গুচ্ছ আকারে ফুটে আছে। হাওয়ায় দুলে ওঠা কাশফুলে মুগ্ধ হচ্ছেন দর্শনার্থীরা।
চরের যে অংশে কাশবনের সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে কোনো জনবসতি নেই। পাশেই রয়েছে স্বচ্ছ পানির লেকের মতো একটি জলধারা। কাশফুলঘেরা সেই জলধারায় ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে ঘুরছেন দর্শনার্থীরা। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরছেন, কেউ সন্তানদের সঙ্গে খেলায় মেতে উঠেছেন। নির্জন চরটিতে বিকেলের এই সময়টুকু যেন ব্যস্ত জীবনের বাইরে একটু স্বস্তির অবকাশ।
এ বিষয়ে স্থানীয় লোকজন জানান, তিস্তায় আগের মতো পানিপ্রবাহ না থাকায় নদীর বিভিন্ন অংশে বিস্তীর্ণ বালুচর জেগে উঠেছে। ভাদ্র মাসের শেষদিকে এ এলাকায় কাশফুল ফুটতে শুরু করে এবং কার্তিক মাস পর্যন্ত থাকে বলে জানান তারা। এ সময় পুরো এলাকা শুভ্র কাশফুলে সেজে ওঠে। বিকেল হলেই এখানে বসে চায়ের আড্ডা। গল্পে মশগুল হন বিভিন্ন বয়সী মানুষ।
গয়াবাড়ি ইউনিয়নের শুটিবাড়ি এলাকার আব্দুল হামিদ মিয়া মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন কাশফুল দেখতে। তিনি বলেন, ‘সত্যিই জায়গাটি অনেক সুন্দর লাগছে। চারদিকে সাদা কাশফুল, আবার ফুলের মাঝখানে স্বচ্ছ পানির জলাধার, অসাধারণ এক দৃশ্য। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মেয়েকে নিয়ে এসেছি। সন্ধ্যা হয়ে গেলেও মেয়ে যেতে চাইছে না।’
সন্ধ্যার আলোয় নদীর ধারের পুরো চর সাদা কাশফুলে ঝলমল করে ওঠে। দর্শনার্থীদের কেউ ছবি তুলছেন, কেউ মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করছেন। ১৩ বছর বয়সী প্রীতম বাবার কাছে কাশফুল তুলে দেওয়ার জন্য বায়না ধরেছিল। বাবা মাহবুবার রহমান কাশফুল হাতে তুলে দিতেই সে খুশিতে আত্মহারা। মাহবুবার রহমান বলেন, ‘এমনিতেই এই তীরের পরিবেশ মুগ্ধ হওয়ার মতো। তার ওপর একসঙ্গে এত কাশফুল সত্যিই মন শান্ত করে দেয়। ভালো লাগায় পরিবার নিয়ে প্রায়ই চলে আসি।’
কালিরডাঙ্গা এলাকা থেকে ঘুরতে এসেছেন ফরিদ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘শহরে মানুষের ঘুরতে যাওয়ার জায়গা নেই বললেই চলে। তাই সবাই চিরচেনা কাশফুল দেখতে তিস্তার চরে ঘুরতে এসেছেন। আমিও স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে এসেছি।’ এ সময় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কাশবনের ভেতরে ছবি তুলছিলেন তিনি।
পশ্চিম খড়িবাড়ি গ্রামের স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘যেমনটি ভেবেছিলাম, এসে দেখি তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর। অনেক দূর পর্যন্ত কাশফুল ছড়িয়ে আছে। আশপাশে দু-একটি খাবারের দোকান থাকলে এখানে গ্রামীণ মেলার মতো পরিবেশ তৈরি হতো। এখানে এসে সত্যিই অসাধারণ সময় কাটালাম।’
মতির বাজার এলাকার বাসিন্দা হাফিজুর রহমান জানান, এক-দুই বছর ধরে এখানে কাশফুল ফুটছে। বিকেল হলেই অনেক মানুষ এখানে আসেন। ছবি তোলেন, ভিডিও করেন। ছুটির দিনে ভিড় আরও বেড়ে যায়।
নাউতারা এলাকা থেকে ঘুরতে এসেছেন দুই তরুণ-তরুণী। তাদের ভাষ্য, শুধুমাত্র কাশফুলের টানেই তারা তিস্তা নদীর তীরে ঘুরতে এসেছেন। এত কাশফুল একসঙ্গে কখনো দেখেননি। কাশবনে দাঁড়িয়ে অনেক ছবি তুলেছেন তারা। বিকেলটা তাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে, তখন কাশফুলের শুভ্রতা আরও মায়াবী হয়ে ওঠে। নরম আলোয় বালুচর, জলধারা আর কাশবন মিলে তৈরি করে অন্যরকম এক দৃশ্য। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে তাই প্রতিদিনই তিস্তার চরে ছুটে আসছেন ডিমলা ও আশপাশের এলাকার প্রকৃতিপ্রেমীরা।