সাভারের আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী শামীম রেজাকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নির্যাতন না করা ও মামলা থেকে বাঁচানোর প্রলোভন দেখিয়ে আসামির স্ত্রীর কাছ থেকে আইফোন এবং লাখ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. নেয়ামত উল্লাহর বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, মামলার গোপনীয়তা ভঙ্গ করে নথিপত্র পাচার, জব্দকৃত আলামতের টাকা সরিয়ে ফেলা এবং আসামির স্ত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সখ্য গড়ে তোলার মতো গুরুতর সব প্রমাণ মিলেছে অনুসন্ধানে।
জানা গেছে, গত ১০ জুন কক্সবাজার থেকে শামীম রেজাকে গ্রেপ্তারের পর তার কাছে থাকা নগদ ৩ লাখ টাকা আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়। কিন্তু সেই টাকা জব্দলিপিতে না দেখিয়ে সরিয়ে ফেলা হয়। পরবর্তীতে রিমান্ডে নির্যাতন না করার শর্তে অভিযুক্ত এসআই নেয়ামত উল্লাহ ও এএসআই লিমনকে দুটি দামি ‘আইফোন ১৭ প্রোক্স ম্যাক্স’ (যার আনুমানিক বাজারমূল্য সাড়ে চার লাখ টাকা) দিতে বাধ্য হোন আসামির স্ত্রী। এছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করার কথা বলে বিভিন্ন সময়ে আরও প্রায় ৩ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত একাধিক অডিও ও ভিডিও রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এসআই নেয়ামত উল্লাহ মামলার সংবেদনশীল নথিপত্র ও জব্দকৃত আলামত আসামির স্ত্রীর কাছে পাচার করেছেন। এমনকি আসামির স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে কারাগারে গিয়ে আসামির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়টিও ফোনালাপে স্পষ্ট হয়েছে।
এ ছাড়া ঘুষ ও অনৈতিকতার অভিযোগ ধামাচাপা দিতে এবং সহানুভূতি অর্জনের জন্য ওই পুলিশ কর্মকর্তা নানা ফন্দি আঁটেন। নিজেকে সৎ প্রমাণ করতে মসজিদে বসে পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে ভিডিও পাঠানোর প্রমাণও মিলেছে।
এক ফোনালাপে এসআই নেয়ামতকে শামীমের স্ত্রী সুমাইয়া সাথীকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি তো স্যারদের সঙ্গে সর্বোচ্চটা চেষ্টা করতেছি, সে যেন অন্য কোনো মামলায় না পড়ে।’ অপর এক ভয়েস রেকর্ডে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের কোন কথাটা রাখি নাই? ফোন সাথে সাথে রিসিভ করেছি, অবর্তমানেও খবরাখবর রেখেছি।’
এদিকে গ্রেপ্তার শামীমের অটো গ্যারেজের চাবি ও জব্দ মালামাল এসআই নেয়ামতের হেফাজতে থাকলেও ছয় দফায় প্রায় অর্ধকোটি টাকার মালামাল চুরি হয়ে যায়। এই চুরির সঙ্গে বহিষ্কৃত এক ছাত্রদল নেতার লোকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এসআই নেয়ামত অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতার পক্ষ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে ফোনালাপে কৌশল বদলে ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে নতুন মামলা করতে আসামির স্ত্রীকে চাপ দেন তিনি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. নেয়ামত উল্লাহ প্রশ্ন এড়িয়ে যান। বিস্তারিত জানাবেন বলে সময় নিলেও পরবর্তীতে তাকে আর ফোনে পাওয়া যায়নি।
মাদক ব্যবসায়ী শামীমের স্ত্রী সুমাইয়া সাথী জানান, রিমান্ড এড়ানো ও নতুন মামলায় নাম না দেওয়ার কথা বলে ধাপে ধাপে দুটি আইফোন ও পরিবারের জমানো টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা ওই এসআইয়ের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছি।
এ বিষয়ে সাভার মডেল থানার নবাগত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, আমি গতকালই নতুন যোগদান করেছি, তাই পূর্বের বিষয়ের তথ্য জানা ছিল না। তবে স্পষ্ট করে বলতে চাই, কোনো অপরাধী বা মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে অনৈতিক চুক্তির সুযোগ নেই। প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান ইশানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশের আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়ে ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হরেকৃষ্ণ জানান, প্রবিধান (পিআরবি) অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনোভাবেই রাষ্ট্রপক্ষের গোপনীয় তথ্য আসামি পক্ষে পাচার করতে পারেন না। আসামির সঙ্গে অনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করা বা সুবিধা গ্রহণ করা মারাত্মক অপরাধ এবং এর জন্য বিভাগীয় কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
উল্লেখ্য, এসআই নেয়ামত উল্লাহ চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি সাভার মডেল থানায় যোগদান করেন। তিনি সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন বলেও জানা গেছে। গত ২২ মে সাভারে মাদক সিন্ডিকেটের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে দেশ টিভি ও এসএ টিভির সংবাদকর্মীরা হামলার শিকার হন। সেই হামলার পর আত্মগোপনে চলে যাওয়া মূল হোতা শামীম রেজাকে গত ১০ জুন কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।