সিরাজগঞ্জের সায়দাবাদ পাওয়ার প্ল্যান্ট ফায়ার স্টেশনের কোয়ার্টার থেকে মো. সিহাব উদ্দিন (পরিচিত নম্বর: ২০০২/৪০০৬৪১) নামে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের এক গাড়িচালকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত ১৮ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে মানসিক হতাশা থেকে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে পুলিশের ধারণা। তবে চাকরির তদবির ও বদলিকে কেন্দ্র করে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সামনে আসায় ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।

নিহত সিহাব উদ্দিন বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার নাংলু গ্রামের মো. মাহবুবুর রহমানের ছেলে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তার মূল কর্মস্থল ছিল শাহজাদপুরের বাঘাবাড়ী ঘাট নদী ফায়ার স্টেশন। তবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) শহীদ মো. আতাহার হোসেনের টেলিফোনিক নির্দেশে তিনি সায়দাবাদ পাওয়ার প্ল্যান্ট ফায়ার স্টেশনে সংযুক্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

ফায়ার স্টেশন সূত্র জানায়, ঘটনার দিন দুপুরে অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গোসল করতে গেলে সিহাব ড্রাইভারদের জন্য নির্ধারিত একটি কক্ষে একা ছিলেন। কিছুক্ষণ পর সহকর্মীরা কক্ষে প্রবেশ করে তাকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গামছা পেঁচানো অবস্থায় ঝুলতে দেখেন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সহকর্মীর দাবি, কয়েকজনকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে সিহাব তাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা দেওয়া হলেও চলমান নিয়োগে কোনো প্রার্থী উত্তীর্ণ হননি। এরপর ওই কর্মকর্তা সিহাবের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সহকর্মীদের ভাষ্য, পাওনাদারদের চাপ, মানসিক অস্থিরতা এবং আর্থিক সংকটের কারণে তিনি চরম হতাশায় ভুগছিলেন। আত্মহত্যার আগে ফোনে কারও সঙ্গে অনুনয়-বিনয় করতেও দেখা গেছে বলে তারা দাবি করেন।

এদিকে নিহতের স্ত্রী মোছা. লাবনী আক্তার তার স্বামীর মৃত্যুর জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) শহীদ মো. আতাহার হোসেনকে দায়ী করে অভিযোগ করেছেন।

পারিবারিক সূত্রের দাবি, ২০১৯ সালে রংপুরে কর্মরত অবস্থায় সিহাবের সঙ্গে ওই কর্মকর্তার পরিচয় হয়। এরপর থেকে তার মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন নিয়োগ ও বদলির কাজ টাকার বিনিময়ে করা হতো। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ৫০ লাখ টাকা পরবর্তী নিয়োগে সমন্বয়ের কথা বলে আটকে রাখা হয়। পরে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে পরিচালকের বদলি ঠেকানোর জন্য আরও ৩৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৮৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

পরিবারের ভাষ্য, চলমান নিয়োগে কোনো প্রার্থী উত্তীর্ণ না হওয়ায় এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর পাওনাদারদের চাপ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সিহাব নিজের বাড়ি-জমি বিক্রি করে কিছু অর্থও পরিশোধ করেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে লাবনী আক্তার বলেন, “আমার স্বামী স্যারকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করত। পাওনাদারদের চাপে সে প্রায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল। এখন বাড়িও গেল, স্বামীও গেল। দুই ছেলে নিয়ে আমি কোথায় দাঁড়াব? মানুষের টাকা কীভাবে শোধ করব? আমি তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শহীদ আতাহার হোসেন সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।”

অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, এর আগেও ওই পরিচালকের বিরুদ্ধে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ ঘটনায় সিরাজগঞ্জ সদর থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা হয়েছে। মামলার বাদী হয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের লিডার মো. মমিন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) বজলুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে হতাশা থেকেই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনে কোনো আর্থিক লেনদেন বা অন্য কোনো প্রভাব ছিল কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।