সূর্যের আলো ফোটার আগেই কেউ কোদাল, কেউবা কাস্তে, দাঁ, টুকরি আর রশি হাতে রংপুর নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হন শত শত দিনমজুর। তাদের একটাই লক্ষ্য—দিনের সূর্য ওঠার আগেই নিজের শ্রম বিক্রি করে পরিবারের দুমুঠো অন্নের সংস্থান করা। কেউ মাটি কাটতে দক্ষ, কেউ ইট, বালু ও পাথর বহনে প্রস্তুত, আবার কেউ বাঁশের বেড়া তৈরি বা অন্যান্য দৈহিক শ্রমে অভ্যস্ত। কিন্তু কাজের সন্ধানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাড়ভাঙা অপেক্ষার পর অধিকাংশ দিনই তাদের ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। পরিবারে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ জোগাতে না পেরে চরম হতাশা ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন এসব খেটে খাওয়া মানুষ।
১২ পয়েন্টের ‘কামলার হাট’ ও তীব্র কাজের খরা
রংপুর নগরীর অন্তত ১২টি পয়েন্টে প্রতিদিন বসে দিনমজুরদের এই শ্রমবাজার, যা স্থানীয়ভাবে ‘কামলার হাট’ নামে পরিচিত। নগরীর গনেশপুর, শাপলা চত্বর, স্টেশন রোড, মডার্ন মোড়, সাতমাথা, মাহিগঞ্জ, দর্শনা, টার্মিনাল, নজিরহাট, তাজহাট, লালবাগ ও চিকলি এলাকায় প্রতিদিন ভোরে গ্রাম থেকে আসা শ্রমিকেরা শ্রম বিক্রির আশায় ভিড় করেন।
স্থানীয়দের চাহিদা অনুযায়ী এসব হাট থেকে শ্রমিকেরা দৈনিক মজুরি বা চুক্তিতে কাজে যান। তবে গত এক মাস ধরে এই হাগুলোতে কাজের সংকট চরমে পৌঁছেছে। শ্রমিকদের ভাষ্যমতে, আগে যেখানে সপ্তাহে অন্তত চার দিন কাজের সুযোগ মিলত, সেখানে বর্তমানে অনেকের ভাগ্যে জুটছে মোটে এক বা দুই দিন।
দিনভর অপেক্ষার পর খালি হাতে ফেরা
প্রতিটি হাটে প্রতিদিন প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ জন দিনমজুর কাজের সন্ধানে আসেন। যাদের একটি বড় অংশ আশপাশের গ্রাম থেকে জীবিকার টানে শহরে আসেন। গ্রামে কৃষিকাজ ও স্থানীয় কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় তারা শহরে ভিড় করছেন, কিন্তু এখানেও কাজের অপ্রতুলতায় বাড়ছে বেকার শ্রমিকের দীর্ঘ সারি।
গণেশপুর ‘কামলার হাটে’ আসা শিবপুর গ্রামের দিনমজুর সাইদুল ইসলাম জানান, গত এক মাসে তিনি মাত্র পাঁচ দিন কাজ পেয়েছেন; বাকি ২৫ দিনই তাকে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কষ্টে সংসার চালাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “জীবনে কখনো কাজের এমন সংকট দেখিনি।”
একই হাটের নিয়মিত মুখ চান মিয়া (৫২) গত এক সপ্তাহে কাজ পেয়েছেন মাত্র দুই দিন। মাটি কাটার কাজ করে দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরি পেলেও তা দিয়ে স্ত্রী ও তিন সন্তানের সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাটে বসে থাকি। কিন্তু কাজের লোক নিতে কেউ আসে না। বাধ্য হয়ে চড়া সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে।”
দেওডোবা গ্রাম থেকে শাপলা চত্বরে আসা আনোয়ারুল ইসলাম (৪৮) বলেন, “কাজের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকি, কিন্তু কাজ নেই। পরিবার নিয়ে খুব মানবেতর জীবনযাপন করছি।” মমিনপুর থেকে আসা জামবাবু বর্মণ ও গণেশপুরের আমির হোসেন জানান, ভূমিহীন এসব মানুষের প্রতিদিনের উপার্জনের ওপরই নির্ভর করে তাদের পরিবার, চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ। কাজ না থাকায় অনেকেই এখন একবেলা খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন বা চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয়দের মতে, বহুমুখী কারণে এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। গণেশপুর এলাকার বাসিন্দা হোসেন আলী জানান, বর্তমানে এলাকায় নির্মাণকাজ আগের মতো হচ্ছে না। বাড়িঘর নির্মাণ কমে যাওয়ায় মাটি, বালু ও ইট বহনের মতো দিনমজুরদের কাজের সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। এছাড়া মাটির কাজ ও বাঁশের কাজের চাহিদাও বর্তমানে বেশ কম।
এই গভীর সংকটের মাঝেও কিছুটা আশার কথা শুনিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। মমিনপুর এলাকার কৃষক সাবিরুল ইসলাম জানান, খেতের আমন ধান পাকতে শুরু করেছে। আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ধান কাটা শুরু হবে। এর পরপরই আলু, ভুট্টা এবং শীতকালীন সবজি চাষের ব্যস্ত মৌসুম শুরু হবে। তখন কৃষিশ্রমিকের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং দিনমজুরেরা আবারও কাজের সুযোগ পাবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।