সাতক্ষীরার দেবহাটায়
হাসপাতালে ঢুকে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী এখনো গ্রেপ্তার হননি। পলাতক থাকা অবস্থায় তাঁর ফেসবুক আইডি থেকে একের পর এক পোস্ট দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
বৃহস্পতিবার রাতে ও শুক্রবার সকালে পৃথক অভিযান চালিয়ে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের মোক্তার হোসেন মোড়ল ও নাজিরের ঘের এলাকার আসাদুল মোল্লা। দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন তাঁদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে সুবর্ণাবাদ গ্রাম থেকে মোক্তার হোসেন মোড়লকে এবং শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নাজিরের ঘের এলাকা থেকে আসাদুল মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার প্রধান আসামিসহ অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
১০ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা
নিহত শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলাটি করেন। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামসুল রহমানের ছেলে। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পাশাপাশি কামিল পাস করেছিলেন। হোমিওপ্যাথি নিয়েও পড়াশোনা করেছিলেন তিনি। তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছে।
পরিবারের ভাষ্য, শামীম দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। কখনো স্বাভাবিক আচরণ করতেন, আবার কখনো অসংলগ্ন আচরণ করতেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর হামলা
মামলার বিবরণ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার শামীম ও তাঁর স্ত্রীর কথোপকথনের একটি অডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য রয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ওই দিন শামীমের বাড়িতে হামলার চেষ্টা করা হয় এবং স্থানীয় একটি বাজারে তাঁকে মারধর করা হয়।
পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে চিকিৎসা নেওয়ার সময় একদল লোক তাঁকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আবার মারধর করে। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিন রাতেই ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে একদল লোক মিছিল নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামলা চালায়। সেখান থেকে শামীমকে বের করে নিয়ে আবারও মারধর করা হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
ফেসবুকে পোস্ট, গ্রেপ্তার নিয়ে স্বজনদের ক্ষোভ
ঘটনার পর প্রধান আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজনেরা। শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান জানান, দুই আসামি গ্রেপ্তারের খবর তাঁরা পেয়েছেন। অন্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জেনেছেন। মামলার তদন্ত ও অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের স্বার্থে পুলিশের অনুরোধে এজাহারের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে চান না বলেও জানান তিনি।
জানা গেছে, ফজলুল হক আমিনী ‘Fh Ameni’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে নিয়মিত পোস্ট দিচ্ছেন। শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে দেওয়া একটি পোস্টে তিনি লেখেন, “আমি আপনাদের মাঝে থাকবো না, যেকোনো সময় আমাকে এরেস্ট করা হবে, কিন্তু মোনাজাতে আমাকে শামিল রাখবেন।”
ওই পোস্টে তিনি আরও লেখেন, “এ যুগের গাজী ইলমুদ্দিন হিসেবে আমাকে এবং এই অপারেশনে যারা অংশগ্রহণ করেছিল সকলকে যেন কবুল করে নেন।”
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে শামীম ও তাঁর স্ত্রীর কথোপকথনের অডিও যুক্ত করে একটি পোস্ট দেন তিনি। একই দিন দুপুরে দেওয়া আরেকটি পোস্টে শামীমের মানসিক অসুস্থতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
দেবহাটা থানার ওসি এইচ এম শাহীন বলেন, এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধান আসামিসহ অন্যদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, মামলার অভিযোগগুলো তদন্তাধীন। আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আইনগতভাবে নির্দোষ বলে বিবেচিত হবেন।