এক প্রান্তে পুরোনো একটি বাড়ি। বাড়িটির জানালায় সারাদিন রোদ পড়ে, অথচ ঘরের ভেতরটা যেন সবসময় একটু অন্ধকার। সেই বাড়িতেই একা থাকত অরুণিমা।
বাইরের মানুষ তাকে দেখলে বলত, “মেয়েটা বড় শান্ত!”
কিন্তু কেউ জানত না, সেই শান্ত মুখের আড়ালে কত কথার ঢেউ প্রতিদিন আছড়ে পড়ে।
অরুণিমার অভ্যাস ছিল রাতে ঘুমোবার আগে পুরোনো ডায়েরিটা খুলে বসা। ডায়েরির পাতায় লেখা থাকত ছোট ছোট বাক্য—
“সব কথা বলা যায় না।”
“কিছু মানুষ দূরে গিয়েও থেকে যায়।”
“কিছু শব্দ কানে শোনা যায় না, শুধু মনে বাজে।”
একদিন ডায়েরির শেষ পাতায় সে লিখল—
“যদি কোনোদিন কেউ আমার না-বলা কথাগুলো পড়তে পারে, তবে সে-ই বুঝবে আমাকে।”
তারপর ডায়েরিটা বন্ধ করে জানালার পাশে রেখে দিল।
পরদিন সকালে ডাকপিয়ন একটি চিঠি দিয়ে গেল। প্রেরকের নাম নেই। কাঁপা হাতে খাম খুলে অরুণিমা দেখল, মাত্র একটিই বাক্য—
“তুমি যা বলতে পারোনি, আমি তা শুনেছি।”
অরুণিমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
চিঠির সঙ্গে ছিল একটি পুরোনো শুকনো শিউলি ফুল।
সে ফুলটি চিনতে পারল। বহু বছর আগে স্কুলের শেষ দিনে, তার প্রিয় শিক্ষক অনিরুদ্ধ স্যার তাকে বলেছিলেন—
“অরুণিমা, মানুষের সবচেয়ে গভীর কথাগুলো সবসময় শব্দ হয়ে বেরোয় না। কখনও কখনও নীরবতাই সবচেয়ে জোরে কথা বলে।”
সেদিনের পর স্যার অন্য শহরে চলে গিয়েছিলেন।
অরুণিমা চিঠিটা আবার পড়ল। তারপর বহুদিন পর ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে থেমে গেল একটি পুরোনো পাতায়।
সেখানে লেখা—
“আজ স্যার বললেন, নিজের কণ্ঠকে কখনও হারিয়ে ফেলিস না। একদিন তোর লেখা অন্য কারও নীরবতার ভাষা হবে।”
হঠাৎ অরুণিমার মনে হলো, এতদিন সে নিজের ভেতরের শব্দগুলোকে শুধু জমিয়ে রেখেছে। কাউকে শোনায়নি।
সেদিনই সে সিদ্ধান্ত নিল—ডায়েরির পাতাগুলো আর বন্ধ থাকবে না।
সে নিজের লেখা নিয়ে একটি ছোট পত্রিকায় পাঠাল। কয়েক সপ্তাহ পর সেই লেখা প্রকাশিত হলো।
লেখাটির শিরোনাম ছিল— ‘অন্তর্লীন অনুরণন’।
প্রকাশের দিনই অরুণিমার কাছে আরেকটি চিঠি এল।
খাম খুলে সে দেখল, অনিরুদ্ধ স্যারের হাতের লেখা।
“তোর লেখা পড়লাম। তুই অবশেষে নিজের কণ্ঠ খুঁজে পেয়েছিস। মনে রাখিস, সত্যিকারের শব্দ কখনও হারিয়ে যায় না। মানুষের হৃদয়ের গভীরে তারা অনুরণন হয়ে থেকে যায়।”
চিঠিটা বুকে চেপে অরুণিমা জানালার পাশে দাঁড়াল।
বাইরে তখন শিউলি ঝরছে।
কেউ কাছে নেই, তবু তার মনে হলো—দূর কোথাও থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ যেন বলছে,
“শুনতে পাচ্ছিস তো?”
অরুণিমা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“হ্যাঁ স্যার, এবার আমি নিজের ভেতরের সেই শব্দটাও শুনতে পাচ্ছি।”
সেদিন প্রথমবার তার ঘরটা আর নীরব মনে হলো না।
কারণ কিছু অনুরণন শব্দের বাইরে জন্ম নেয়—
আর হৃদয়ের গভীরে, নিঃশব্দেই, বেঁচে থাকে।