স্টেশনটার নাম ছিল শালবনি। ছোট্ট স্টেশন, দু’পাশে কাশফুলের সারি, আর দূরে লাল মাটির পথটা হারিয়ে গেছে শালবনের ভিতর।
প্রতিদিন বিকেল পাঁচটার ট্রেনে এসে দাঁড়াত অদিতি। হাতে থাকত একটি পুরোনো নীল খাম। কেউ জানত না, খামের ভিতরে কী আছে।
তিন বছর আগে এই স্টেশনেই শেষবার দেখা হয়েছিল অয়নের সঙ্গে।
অয়ন বলেছিল,
“অদিতি, আমাকে কিছুদিন সময় দাও। ফিরে এসে তোমাকে নিয়ে যাব।”
অদিতি বিশ্বাস করেছিল।
তারপর কেটে গিয়েছিল এক বছর, দুই বছর, তিন বছর। অয়ন আর ফেরেনি। ফোন বন্ধ, ঠিকানা বদলে গেছে, পরিচিতদের কাছেও কোনো খবর নেই।
তবু অদিতি অপেক্ষা ছাড়েনি।
প্রতিদিন একই সময়ে এসে বেঞ্চটায় বসত। কখনও ট্রেন আসত, যাত্রীরা নামত, কেউ অপেক্ষা করত আপনজনের জন্য, কেউ বিদায় জানিয়ে চলে যেত। শুধু অদিতির অপেক্ষার কোনো শেষ হতো না।
একদিন স্টেশনের বৃদ্ধ চা-ওয়ালা জিজ্ঞেস করল,
“মা, এতদিন ধরে কাকে খুঁজছ?”
অদিতি মৃদু হেসে বলল,
“যাকে পাওয়ার কথা ছিল।”
বৃদ্ধ বলল,
“আর যদি সে না আসে?”
অদিতি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“তাহলে বুঝব, আমার পাওয়াটাই হয়তো তাকে হারানো ছিল।”
সেদিনও অয়ন এল না।
কিন্তু বাড়ি ফিরে অদিতি প্রথমবার নীল খামটা খুলল।
ভিতরে ছিল একটি চিঠি—অয়নের লেখা।
চিঠিটা সে তিন বছর আগে পেয়েছিল। কিন্তু কখনও খোলেনি। কারণ খামের ওপর অয়ন লিখেছিল—
“যেদিন বুঝবে আমি আর ফিরব না, সেদিন পড়বে।”
কাঁপা হাতে অদিতি চিঠি পড়তে শুরু করল।
অয়ন লিখেছিল—
“অদিতি,
আমি জানি, তুমি অপেক্ষা করবে। তাই তোমাকে অনুরোধ করছি—আমার জন্য তোমার জীবন থামিয়ে রেখো না। আমার ফিরে আসার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু তোমার সুখী হওয়ার অধিকার আছে।
যদি কোনোদিন আমাকে না পাও, মনে করবে—আমাদের ভালোবাসা হারায়নি। শুধু তার ঠিকানা বদলে গেছে।
তুমি আমাকে পেয়েছিলে তোমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়ে। সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
চিঠির শেষ লাইনে লেখা ছিল—
“আমাকে পাওনি বলে কেঁদো না। আমাকে পেয়েছিলে—এই সত্যিটুকু মনে রেখো।”
অদিতির চোখ ভিজে উঠল।
পরদিন বিকেল পাঁচটায় সে আর স্টেশনে গেল না।
তার বদলে জানলার ধারে বসে নিজের ডায়েরির প্রথম পাতায় লিখল—
“জীবনে সব পাওয়া হাতে ধরা দেয় না। কিছু মানুষ আসে আমাদের বদলে দিতে, থেকে যেতে নয়। তাদের না-পাওয়ার মধ্যেও এক ধরনের গভীর পাওয়া লুকিয়ে থাকে।”
বহু বছর পর অদিতি আবার সেই স্টেশনে গেল।
সঙ্গে ছিল তার ছোট্ট মেয়ে।
মেয়েটি মায়ের হাত ধরে জিজ্ঞেস করল,
“মা, তুমি এখানে আগে এসেছিলে?”
অদিতি হাসল।
দূরে একটি ট্রেন হুইসেল দিয়ে চলে গেল।
সে মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“হ্যাঁ। একদিন এখানে আমি একজনকে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতাম। আজ বুঝেছি, সেদিন আসলে আমি নিজেকেই খুঁজছিলাম।”
ট্রেনটা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল।
অদিতি আর ফিরে তাকাল না।
কারণ কিছু অপেক্ষার শেষ হয় মানুষকে পেয়ে নয়—
নিজেকে ফিরে পেয়ে।