কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রায় এক বছর ধরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে ভুয়া খবর ও অপপ্রচার চালানোর একটি নেটওয়ার্ক উন্মোচন করেছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, গাইবান্ধা জেলার একজন ব্যক্তি এআই চ্যাটবট ‘ক্লড’ ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে গণহারে এসব অপপ্রচারমূলক ভুয়া বাংলা খবর ও ভিডিও তৈরি করতেন। খবর দ্য প্রিন্টের
গতকাল বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত ‘এআই-এর অপব্যবহার শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধ: সেপ্টেম্বর ২০২৬’ শীর্ষক ১৫৪ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি
অ্যানথ্রপিকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে ‘জিটিজি-৫৪০০৬’ সংকেতে চিহ্নিত এই নেটওয়ার্কটি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যেমন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক কমিটির (বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টি) বিরুদ্ধে পরিকল্পিত আক্রমণাত্মক কনটেন্ট ছড়াত।
একই সঙ্গে এসব খবরের একটি অংশ ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের অনুকূলে ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে এই অপপ্রচারের পেছনে কোনও দেশের সরকার বা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের সরাসরি প্রমাণ মেলেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্ল্যাটফর্মের নজরদারি ও বিধিনিষেধ এড়াতে ওই ব্যক্তি গত ১৬ মাসে ক্লডের ২৯টি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন। তিনি ‘fake_news_3.py’ নামক একটি পাইথন স্ক্রিপ্টের সাহায্যে এক ক্লিকেই ১৫টি ভুয়া খবরের শিরোনাম, ৩টি বিভ্রান্তিকর অনুচ্ছেদ এবং ১৫টি ইমেজ প্রম্পট তৈরি করতেন। সব মিলিয়ে তিনি কমপক্ষে ১,৫০০টি ভুয়া শিরোনাম এবং ৩০০টি সম্পূর্ণ কাল্পনিক খবর তৈরি করেন।
পরবর্তীতে এসব কনটেন্ট ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ও টিকটকের মাধ্যমে ছড়ানো হতো। মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ ও কম শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে গুজব ছড়িয়ে দেয়া। ব্যবহারকারীর আসল অবস্থান গোপন রাখতে একটি থার্ড-পার্টি ভিপিএন বা প্রক্সি ব্যবহার করে এক মাস আগেই ইউটিউবে ভিডিওগুলো শিডিউল করে রাখা হতো। অ্যানথ্রপিক জানায়, ওই ব্যক্তির নিজস্ব নোট অনুযায়ী তিনি জানতেন যে এসব তথ্য ভুয়া এবং এগুলো সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যেই অত্যন্ত উসকানিমূলক ভাষায় লেখা হতো।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রচারিত ভুয়া কন্টেন্টগুলোতে মূলত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক কমিটিকে ‘তালেবান ধাঁচের শাসন’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিত্রায়িত করা হতো। পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ও ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে উপস্থাপন, তাদের ওপর হত্যাচেষ্টার মনগড়া গল্প এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গোপন আঁতাতের মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেয়া হতো।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে।
অ্যানথ্রপিকের ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের এই পুরো সময়টিতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকায় অপপ্রচারটি মূলত একটি বিরোধী দলের রাজনৈতিক স্বার্থে পরিচালিত হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচ্য তিনটি প্ল্যাটফর্মজুড়েই বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি চ্যানেলে ভিডিওগুলো প্রদর্শিত হয়েছিল। তবে অ্যানথ্রপিক সবকটি পাবলিশিং অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করতে পারেনি এবং তাদের নিজস্ব গণ্ডির বাইরে এসব খবর কতটা ছড়িয়েছে তার প্রমাণ মেলেনি।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা নিজস্ব তদন্তে এটি শনাক্ত করার পর যুক্ত থাকা অ্যাকাউন্টগুলো নিষিদ্ধ করেছে, নেটওয়ার্কের আচরণগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে শনাক্তকরণ ব্যবস্থা তৈরি করেছে এবং সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে এসব তথ্য জানিয়ে সতর্ক করেছে।