বৃষ্টিটা সেদিন অদ্ভুতভাবে নামছিল। যেন আকাশও কারও সঙ্গে অভিমান করে সারাদিন ধরে কেঁদে চলেছে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে সহেলী রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। হাতে ফোন। স্ক্রিনে একই নাম—অর্ণব।
শেষ কথা হয়েছিল সাত দিন আগে।
সাত দিন—মাত্র সাত দিন। অথচ সহেলীর কাছে মনে হচ্ছিল, সাতটি বছর কেটে গেছে।
অর্ণব রাগ করে বলেছিল,
“তুমি আমাকে একটুও বোঝো না।”
সহেলী সেদিন উত্তর দেয়নি। শুধু ফোনটা কেটে দিয়েছিল।
তারপর থেকে দুজনেই চুপ।
অর্ণব ভাবছিল, সহেলী নিশ্চয়ই আর তাকে গুরুত্ব দেয় না।
আর সহেলী ভাবছিল, অর্ণব যদি সত্যিই তাকে ভালোবাসে, তবে একবারও কি ফোন করতে পারে না?
দুজনেরই কষ্ট ছিল। দুজনেরই অপেক্ষা ছিল। শুধু কেউ কারও কাছে হার মানতে চাইছিল না।
সেদিন সন্ধ্যায় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
মেঘলা দরজা খুলে অবাক হয়ে গেল।
সামনে অর্ণব।
ভিজে একাকার। হাতে একটি ছোট্ট কাগজের প্যাকেট।
সহেলী কিছু বলল না।
অর্ণবও না।
কয়েক মুহূর্ত দুজনেই নীরব।
শেষ পর্যন্ত অর্ণব প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“তোমার জন্য।”
সহেলী প্যাকেট খুলে দেখল—একটি ছোট্ট নীল ছাতা।
সহেলীর চোখে জল এসে গেল।
“ছাতা কেন?”
অর্ণব মৃদু হেসে বলল,
“তুমি বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসো, জানি। কিন্তু অসুস্থ হয়ে গেলে আবার আমাকেই চিন্তা করতে হয়।”
সহেলী মুখ ফিরিয়ে নিল।
“চিন্তা করার দরকার নেই।”
“আছে।”
“কেন?”
অর্ণব একটু থেমে বলল,
“কারণ অভিমান করে দূরে থাকা যায়, কিন্তু ভালোবাসা থেকে দূরে থাকা যায় না।”
সহেলী এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
চোখের জল মুছতে মুছতে বলল,
“তুমি এতদিন ফোন করোনি কেন?”
অর্ণব নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
“অপেক্ষা করছিলাম।”
“কিসের?”
“তোমার।”
সহেলী হেসে ফেলল। সেই হাসির মধ্যে জমে থাকা সাত দিনের অভিমান গলে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“আমিও অপেক্ষা করছিলাম।”
অর্ণব অবাক হয়ে তাকাল।
“তাহলে ফোন করোনি কেন?”
সহেলী জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
“অভিমান হয়েছিল।”
“আমারও।”
“তাহলে দুজনেই কষ্ট পেলাম কেন?”
অর্ণব মৃদু হেসে বলল,
“কারণ আমরা দুজনেই ভেবেছিলাম—আগে কে কথা বলবে।”
সহেলী এবার বলল,
“ভালোবাসায় আগে-পরে বলে কিছু থাকে না।”
অর্ণব মাথা নাড়ল।
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছিল।
সহেলী নীল ছাতাটা খুলে বারান্দায় রাখল। তারপর অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“চলো, আজ একটু বৃষ্টিতে হাঁটি।”
অর্ণব হাসল।
দুজন পাশাপাশি বেরিয়ে গেল।
সেদিন তারা কোনো পুরোনো অভিযোগের হিসেব করেনি। শুধু বুঝেছিল—অভিমানেরও একটা ভাষা আছে। সে ভাষায় শব্দ কম, কিন্তু অপেক্ষা আর ভালোবাসা অনেক বেশি।
আর কখনও যদি দুজনের মধ্যে অভিমান আসে, তারা ঠিক করে নিল—
চুপ করে থাকবে না কেউ।
কারণ নীরবতার কাছে অনেক সুন্দর সম্পর্কও একদিন হেরে যায়।