ঃএকটি সাইনবোর্ড আছে, টিনের একটি ঘর আছে, সরকারি কাগজপত্রে আছে শিক্ষার্থী-শিক্ষকের হিসাব—কিন্তু বাস্তবে কোথায় সেই বিদ্যালয়?রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার শহীদবাগ ইউনিয়নের সাব্দী গ্রামের ‘শহীদবাগ বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়’ ঘিরে এমন প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠার দাবি করা এই প্রতিষ্ঠানে ১৩০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে বলে দাবি কর্তৃপক্ষের। রয়েছে একাধিক শিক্ষকও। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে নিয়মিত শিক্ষার্থী-শিক্ষকের উপস্থিতি, পাঠদান কিংবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা কার্যক্রমের দৃশ্যমান চিত্র পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ উঠেছে, কাগজে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম সচল দেখানো হলেও বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। এমনকি প্রশাসনিক পরিদর্শনের সময় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখাতে বাইরে থেকে শিশু এনে শ্রেণিকক্ষে বসানোরও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়টি সরকারি স্বীকৃতি, এমপিওভুক্তি বা অনুদানের আওতায় আসবে—এমন প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন পদে লোক নিয়োগের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়েভ নেওয়া হয়েছে যাহা জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আর এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও তার স্বামী প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আব্দুল হাই। তবে প্রধান শিক্ষক সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
শনিবার সকালে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে দোলার মধ্যে একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘর। বাইরে বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড। কিন্তু বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষা উপকরণ, প্রশিক্ষণসামগ্রী কিংবা নিয়মিত পাঠদানের দৃশ্যমান পরিবেশ চোখে পড়েনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যও একই ধরনের। তাঁদের দাবি, বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস হয়—এমন দৃশ্য তাঁরা দেখেননি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতিও চোখে পড়ে না।
অথচ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক ১৩০ জন ছাত্র-ছাত্রীর কথা এবং প্রতিষ্ঠান খোলা থাকার কথা বললেও সারোজমিনে গিয়ে তার সত্যতা পাওয়া যায়নি,বিশেষায়িত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও শিক্ষা উপকরণেরও দেখা মেলেনি।অথচ বিভিন্ন সরকারি কাগজপত্রে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম সচল দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, নামেই বিদ্যালয়; নিয়মিত ক্লাস হয়—এমন দৃশ্য তারা কখনো দেখেন নাই, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতিও চোখে পড়ে না।
এছাড়া বিদ্যালয়টির বিরুদ্ধে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে প্রশাসনিক পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংকন পাল বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসবেন—এমন খবর পাওয়ার পর তড়িঘড়ি করে আশপাশের এলাকা থেকে সাধারণ শিশুদের এনে শ্রেণিকক্ষে বসানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষার্থী রয়েছে—এমন একটি চিত্র পরিদর্শকদের সামনে তুলে ধরা,তবে তেমন কোন প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রী ছিলেন না। তারা আরোও জানান সাম্প্রতিক কিছুদিন আগে বিদ্যালয় পরিদর্শন হয় কিন্তু সেই দিন শেষ হওয়ার পর ওই শিশুদের আর বিদ্যালয়ে দেখা যায়নি। অর্থাৎ, বাস্তবে শিক্ষার্থী না থাকলেও পরিদর্শনের সময় কৃত্রিমভাবে শিক্ষার্থী উপস্থিতির পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে প্রধান শিক্ষকের স্বামী আব্দুল হাইয়ের নাম রয়েছে। এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, স্বামী-স্ত্রীর প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যালয়ের পরিচালনা ও নিয়োগ কার্যক্রমে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, বিভিন্ন পদে নিয়োগের কথা বলে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়টি ভবিষ্যতে সরকারি সুবিধা পাবে—এমন আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি বা লেনদেনের প্রমাণ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যা, পরিচালনা কমিটি, নিয়োগ প্রক্রিয়া, অর্থ লেনদেন এবং সরকারি স্বীকৃতি বা অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না—সবকিছু খতিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে অডিট বা পরিদর্শনের সময় বাইরে থেকে শিশু এনে উপস্থিতি দেখানোর অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা
জাহিদুল ইসলাম নামে একজন স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনের জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি বিদ্যালয়ের কার্যক্রম যদি কাগজপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয় নয়; এর সঙ্গে শিশুদের শিক্ষার অধিকার এবং সরকারি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতার প্রশ্নও জড়িত।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেফালি খাতুন এর কাছে যাবতীয় অভিযোগ এর বিষয় জানতে চাইলে তিনি সকল বিষয় অস্বীকার করে বলেন, বিশেষ শিশুদের নিয়ে কাজ করা কঠিন হলেও তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার স্বামী সভাপতি থাকার বিষয়টিও সবার সম্মতিতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে পরিদর্শনের দিন বাইরে থেকে শিশু এনে শ্রেণিকক্ষে বসানোর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এ বিষয়ে বিদ্যালযয়ের পরিচালনা কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মনোনীত ব্যক্তি হিসেবে দাবি করে আব্দুল হাই বলেন তার বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ মিথ্যা তিনি নিয়ম তান্ত্রিক ভাবে শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।
উপজেলা ভারপ্রাপ্ত সমাজসেবা কর্মকর্তা আনছার আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পরিদর্শন বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংকন পাল বলেন, পরিদর্শনকালে বিদ্যালয়ের বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। অন্য স্থান থেকে শিশু এনে পরিদর্শকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়ে থাকলে তা চরম অন্যায়। বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানা বলেন, বিশেষায়িত বিদ্যালয়ের নামে কোনো ধরনের অনিয়ম, ভুয়া শিক্ষার্থী প্রদর্শন কিংবা নিয়োগ বাণিজ্যের সুযোগ নেই। অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। নিরপেক্ষ তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়, বিশেষায়িত শিক্ষার নামে ভবিষ্যতে এ ধরনের ‘কাগজের বিদ্যালয়’ গড়ে ওঠার পথও বন্ধ করবে প্রশাসন।