দিনাজপুর জেলা শিশু কর্মকর্তা এমএ ওয়াহেদ আলী। প্রশাসনিক পদে দায়িত্বে থাকলেও আড়ালে গড়ে তুলেছেন ভয়ানক এক সিন্ডিকেট। সরকারি পদের অপব্যবহার, ক্ষমতার দাপট, ভুয়া নথি তৈরি এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে একের পর এক পরিবারকে নিঃস্ব করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া নামে-বেনামে ও আত্মীয়-স্বজনদের ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ভিটেমাটি ও সম্পত্তি কুক্ষিগত করতে তিনি গড়ে তুলেছেন এক অদৃশ্য অপরাধ জগৎ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে ওয়াহেদ আলী তার চারপাশে গড়ে তুলেছিলেন বহুমাত্রিক এক সিন্ডিকেট। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা, পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তা, ভাড়াটে ক্যাডার বাহিনী, সুবিধাভোগী আত্মীয়-স্বজন এবং কিছু কথিত সাংবাদিক। ওয়াহেদ আলীর অপরাধনামা ও তার সিন্ডিকেটের নানা অপকর্মের যাবতীয় তথ্য ও প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে।
মিথ্যা মামলা দায়ের ও একই সাক্ষীর পুনরাবৃত্তি
ওয়াহেদ আলীর সম্পত্তি কুক্ষিগত করার মূল কৌশলই ছিল আত্মীয়-স্বজনদের ব্যবহার করে মিথ্যা মামলার ফাঁদ পাতা। তার পরিকল্পনায় এসব স্বজন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত নিকটাত্মীয়রা বাদী হয়ে নিরপরাধ মানুষের নামে নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও ছিনতাইয়ের মতো মামলা ঠুকে দেন। তবে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো—প্রতিটি মামলার চার্জশিটে ঘুরেফিরে তারই বলয়ের ৩-৪ জন ব্যক্তির সাক্ষ্য ব্যবহার করা হয়, যাদের মধ্যে তার দাপ্তরিক কার্যালয়ের এক কর্মচারীও রয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে ভিটেমাটি ছাড়া করার নেপথ্যে কাজ করেছে ওয়াহেদ আলীর বিশেষ প্রশাসনিক নিরাপত্তা বলয়। তার এক ঘনিষ্ঠ স্বজন পুলিশের এসআই। তার প্রভাবকে ব্যবহার করে পুলিশ প্রশাসনকে নিজের পক্ষে রাখেন তিনি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট ও আইনি ছায়াতলে থাকা এই সিন্ডিকেটের মানসিক নির্যাতনে জমি হারিয়ে একাধিক ভুক্তভোগী আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কথিত সাংবাদিকদের দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা
দীর্ঘদিন দিন ধরে ওয়াহেদ আলী এসব অপকর্ম চালিয়ে গেলেও বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। তার অন্যায় ও জুলুমের ঘটনাগুলো যাতে গণমাধ্যমে প্রকাশ না হয় সেজন্য তিনি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ম্যানেজ করে চলছেন। এছাড়া মূলধারার সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখানো ও প্রভাব প্রয়োগের পাশাপাশি তিনি লালন করেন নিজস্ব কিছু ‘পোষা সাংবাদিক’।
এর আগে একটি জাতীয় দৈনিকে ওয়াহেদ আলীর অনিয়ম নিয়ে প্রাথমিক তথ্য উঠে এলেও পরবর্তীতে রহস্যজনকভাবে স্থানীয় সাংবাদিকরা আর এ বিষয়ে তথ্য দিতে রাজি হননি। অভিযোগ রয়েছে, তার বিষয়ে কোনো তথ্য না দিতে ওই সাংবাদিকদের বড় বড় অঙ্কের টাকা দিয়েছিলেন সরকারি এই কর্মকর্তা।
এমনকি নিজের পক্ষে সাফাই গাইতে তথাকথিত সাংবাদিকদের ব্যবহার করেন ওয়াহেদ আলী। এরকম বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। এদের একজন হলেন মেহেদী হাসান মুরাদ; যিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকের রংপুর জেলা প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে নানা ধরনের প্রতারণা ও জালিয়াতি করে যাচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কথিত সাংবাদিক মুরাদই শিশু কর্মকর্তা ওয়াহেদ আলীর ছত্রছায়ায় এলাকায় দাপিয়ে বেড়ান।শুধু তাই নয়, নিজেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে প্রভাব খাটানোর অভিযোগে মুরাদের শাস্তির দাবিতে সম্প্রতি তার এলাকায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মুরাদের প্রতারণার বিষয়ে ঢাকার ওই দৈনিকটির সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ পেয়েছি আমরা। অনেক আগেই তাকে জেলা প্রতিনিধির পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তবে মুরাদ এখনো নিজেকে ওই পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করছেন এবং তার প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই সম্পাদক বলেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে দিনাজপুর জেলা শিশু কর্মকর্তা এমএ ওয়াহেদ আলীকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।